রেমিট্যান্সযোদ্ধাদের প্রণোদনার টেকসই বাস্তবায়ন হোক

গত বৃহস্পতিবার (১৩ জুন) জাতীয় সংসদে আগামী ২০১৯-’২০ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য দুটো সুখবর রয়েছে। নতুন অর্থবছরের বাজেটে প্রবাসীদের জন্য বীমা সুবিধার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা আগের কোনো বাজেটেই ছিল না। এর মধ্য দিয়ে রেমিট্যান্স-যোদ্ধাদের দীর্ঘদিনের একটি দাবি পূরণ হচ্ছে। এর আওতায় বীমাকারী মারা গেলে, দুর্ঘটনাজনিত স্থায়ী ও সম্পূর্ণ অক্ষমতা বা পঙ্গুত্ববরণ করলে মূল বীমার শতভাগ পরিশোধ করার বিধান রাখা হয়েছে। অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের ভিত্তিতে দাবি পরিশোধ করা হবে।

এবারের বাজেটে প্রবাসীদের জন্য দেওয়া হয়েছে আরেকটি সুখবর- এটিও এবারই প্রথম। বৈধপথে দেশে টাকা পাঠালে ২ শতাংশ হারে প্রণোদনা পাবেন তারা। অর্থ্যাৎ কোন প্রবাসী বিধিসম্মত উপায়ে ১ হাজার টাকা রেমিট্যান্স পাঠালে তিনি ২০টাকা প্রণোদনা পাবেন।

বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, ‘প্রবাসী আয় পাঠানোর ক্ষেত্রে বাড়তি ব্যয় কমানো এবং বৈধপথে অর্থ প্রেরণ উৎসাহিত করতে প্রস্তাবিত বাজেটে ৩ হাজার ৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ফলে বৈধপথে প্রবাসী আয় আসার পরিমাণ বাড়বে এবং হুন্ডি ব্যবসা নিরুৎসাহিত হবে বলে আশা করছি।’

অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ‘বীমা নীতিমালার আওতায় প্রবাসী কর্মীদের জীবন বীমা সুবিধা প্রদান করা হবে। সাধারণত মৃত্যুর ক্ষেত্রে বীমা সুবিধায় প্রিমিয়াম হার ও বীমা অঙ্ক বীমা গ্রহীতাদের বয়সভেদে পার্থক্য হয়ে থাকে। তবে প্রবাসী কর্মীদের একটি গ্রুপ হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে বীমা প্রকল্পটি বা পলিসি সহজীকরণের লক্ষ্যে বীমা গ্রহীতাদের বয়স নির্বিশেষে অভিন্ন প্রিমিয়াম হার আরোপ করা হবে।’

বিভিন্ন স্বীকৃত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পেছনে তিনটি খাতের অবদান সর্বাধিক। এগুলো হলো- গার্মেন্টস, সেবা এবং অভিবাসন খাত। সাধারণভাবে আমরা গার্মেন্টসে সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত হিসেবে চিহ্নিত করে থাকি। এ খাতের কাঁচামাল আমদানির খরচ বাদ দিলে দেখা যায়, অভিবাসী কর্মীদের পাঠানো রেমিট্যান্স থেকে নেট বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন গার্মেন্টসের চাইতে তিনগুণ বেশি। দেশে প্রবাহিত বৈদেশিক সাহায্যের তুলনায় এটি ছয়গুণ এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের বারো গুণ বেশি। তাই এই কথা বলতে বাধা নেই, ‘অভিবাসীর ঘামের টাকা সচল রাখছে দেশের চাকা’। 

বিদেশে কর্মরত শ্রমিকরা প্রতিবছর দেশে প্রায় ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পাঠায়। প্রতিবছর এ মুদ্রা পাঠানো বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০০৫-’০৬ অর্থবছরে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং চলতি অর্থবছরে এটি ৯ গুণ বেড়ে ৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০১৩-’১৪ অর্থবছরে ১৪ দশমিক ২২৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার; ২০১৪-’১৫ অর্থবছরে দেশে আসে ১৫ দশমিক ৩১৬ বিলিয়ন ডলার; ২০১৫-’১৬ অর্থবছরে আসে ১৪ দশমিক ৯৩১ বিলিয়ন ডলার; ২০১৬-’১৭ অর্থবছরে দেশে ১২ দশমিক ৭৬৯ বিলিয়ন ডলার; ২০১৭-’১৮-তে আসে ১৪ দশমিক ৯৮১ বিলিয়ন ডলার এবং ২০১৮-’১৯ অর্থবছরে ১০ মাসে প্রবাসীরা দেশে অর্থ পাঠিয়েছেন ১৩ দশমিক ৩০৩ বিলিয়ন ডলার।

কিন্তু দেশে পাঠানো এই অর্থের দ্বিগুণ অর্থ অবৈধ চ্যানেল হুন্ডির মাধ্যমে পাঠানো হয়। ফলে অন্য দেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়ে যায়। হুন্ডির মাধ্যমে প্রবাসী আয় দেশে আসার ক্ষেত্রে ওই দেশে বসে থাকা হুন্ডির এজেন্টরা প্রবাসীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে নেয়। আর দেশে অবস্থানরত অপর এজেন্ট প্রবাসীদের পরিজনদের কাছে টাকা দিয়ে দেয়। এতে প্রবাসী কষ্টার্জিত অর্থের একটা অংশ বিদেশে পাচার হয়ে যায়। 

এদিকে প্রবাসীরা বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠালে একই সঙ্গে দেশ ও প্রবাসীদের পরিজনরা উপকৃত হন। প্রবাসীরা যখন বৈধ পথে দেশে অর্থ পাঠান তখন ব্যাংকগুলো বাংলাদেশি মুদ্রায় ওই অর্থ স্থানান্তর করে দেশে অবস্থানরত পরিজনদের কাছে হস্তান্তর করে। আর ওই বৈদেশিক মুদ্রা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ অর্থ হিসাবে জমা থাকে।

কিছু অর্থ বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোও জমা রাখে। এ অর্থ বৈদেশিক বাণিজ্য ও ঋণ পরিশোধে ব্যবহৃত হয়। বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ আকারে বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা থাকলে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সহজ শর্তে বৈদেশিক ঋণ পেতে পারে। আমদানির ক্ষেত্রে এলসি (ঋণপত্র) খুলতে দেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে।

গত পাঁচ বছরে কর্ম উদ্দেশ্য নিয়ে বিদেশে যাওয়া অভিবাসীর সংখ্যায় এক ধরনের স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। তদুপরি রেমিট্যান্সের প্রবাহ অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। রেমিট্যান্স আহরণের ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, মানি লন্ডারিংয়ের ওপর আন্তর্জাতিক নজরদারি ব্যাংকসমূহের উৎসাহে বৈধপথে রেমিট্যান্স প্রেরণের হার বেড়েছে। তবে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত এই তিনটি দেশ থেকে পাঠানো রেমিট্যান্সের অনেকটাই এখনো হুন্ডির মাধ্যমে হচ্ছে।

বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর ৭ থেকে ৯ লাখ মানুষ দেশের বাইরে যায়। বিপুলসংখ্যক জনশক্তি বাইরে গেলেও এর প্রায় পুরোটাই অদক্ষ। ফলে তাদের উপার্জনও কম। হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠানো রোধ ও প্রশিক্ষিত করে শ্রমিকদের বিদেশে পাঠাতে পারলে প্রবাসী আয় ৩৩ বিলিয়ন ডলারের কোটা থেকে কয়েক বছরের মধ্যে ৪০ বিলিয়নে উত্তীর্ণ হওয়া অসম্ভব নয়। ‘অবৈধ’ শ্রমিকদের বৈধ করা গেলে প্রবাসী আয় আরো বাড়বে বলে আমরা মনে করি। 

এ অবস্থায় প্রত্যাশা করছি, বাজেটে প্রস্তাবিত রেমিট্যান্সযোদ্ধাদের জন্য প্রণোদনা ও বীমার টেকসই বাস্তবায়ন হোক। বাজেট প্রস্তাবের সুখবরে প্রবাসীরা সত্যিকার অর্থেই অনেক খুশি হয়েছে, বাস্তবায়ন-বিচ্যুতির কারনে যেন তা বিষাদে পরিণত না হয়। একই সাথে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে বিভিন্ন দেশে অবস্থানকারী অবৈধ বাংলাদেশি কর্মীদের কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে বৈধতা প্রদান তথা একটি শৃঙ্খলার মধ্যে ফিরিয়ে আনা হোক। এতে লাভবান হবে স্বপ্নাতুর বাংলাদেশিরা, আরো মজবুত ভিত্তি পাবে আমাদের অর্থনীতি। ##

 

share this news to friends