নিউইয়র্কে এক বছরেও মেলে না পাসপোর্ট, বিড়ম্বনায় প্রবাসীরা

ঢাকায় সহজে পুলিশের ক্লিয়ারেন্স বা ছাড়পত্র মেলে না। এ কারণে নিউইয়র্কে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অনেকের পাসপোর্ট নিয়ে বিড়ম্বনার শেষ হচ্ছে না। কারো আবেদন ৬ মাস, আবার কারো এক বছরের বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে। পাসপোর্ট নিয়ে এমন বিড়ম্বনা আমেরিকাজুড়ে। অবশ্য নিউইয়র্কে বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল বলছে, পুলিশের ছাড়পত্রের ক্ষেত্রে তাদের করার কিছু নেই। ছাড়পত্র ছাড়া পাসপোর্ট দেওয়ার এখতিয়ার তাদের নেই।

ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করছেন, ঢাকায় কেন্দ্রীয় পাসপোর্ট অফিস থেকে আবেদনপত্র পুলিশের বিশেষ শাখায় (এসবি) পাঠানো ও পুলিশি তদন্ত প্রতিবেদন সংগ্রহ করতে জনপ্রতি ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হচ্ছে। ঢাকায় পাসপোর্ট অফিসে যাদের যোগাযোগের লোক নেই, তাদের কেউ কেউ পাসপোর্ট পাওয়ার আশা ছেড়েই দিয়েছেন।

ভুক্তভোগী প্রবাসীরা আরো অভিযোগ করছেন, বাংলাদেশ দূতাবাস কিংবা কনস্যুলেট জেনারেলসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অফিসে যোগাযোগ করে এসব বিষয়ে কোনো সন্তোষজনক জবাব পাচ্ছেন না তারা। তাদের শুধু বলা হচ্ছে, পুলিশি ছাড়পত্র না হলে দূতাবাস বা কনস্যুলেট জেনারেলের কিছু করার নেই।

নিউইয়র্কে বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলের পাসপোর্ট ও ভিসা শাখার প্রথম সচিব মোহাম্মদ শামীম হোসেন বলেন, ‘আমাদের কাজটা সরকারের হয়ে আবেদনকারীর হাতে পাসপোর্ট তুলে দেওয়া। আবেদনকারীর যেকোনো তথ্য যাচাইয়ের দায়িত্ব পুলিশের বিশেষ শাখার। তাদের নির্দেশনা বা তাড়া দেওয়ার এখতিয়ার আমাদের নেই।’

আমেরিকায় প্রতি মাসে পাসপোর্টের কত আবেদন জমা পড়ে, আর এর কতগুলো পুলিশি ছাড়পত্রের জন্য আটকে আছে - এর কোনো সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তবে, প্রবাসী বাংলাদেশিদের অনেকেই অভিযোগ করেন, তাদের পাসপোর্টের আবেদন ঝুলে আছে। কীভাবে এই সংকটের সমাধান পাওয়া যাবে, অনেকের কাছে সে বিষয়ে পরিষ্কার কোনো ধারণা নেই।

ঢাকায় পাসপোর্ট অফিসের একজন কর্মকর্তা বলেন, একই মন্ত্রণালয়ের অধীনে হলেও বহির্গমন ও পাসপোর্ট অধিদফতর পুলিশ বিভাগের ওপর কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। ফলে, পুলিশি ছাড়পত্রকেন্দ্রিক একটা বড় দুর্নীতিচক্র গড়ে উঠেছে। তার মতে, এখন বাংলাদেশে পাসপোর্ট দেওয়ার যে পদ্ধতি, তাতে সব ক্ষমতা পুলিশ বিভাগের হাতে। আবেদনকারী যে তথ্য দিয়েছেন, এগুলোর সত্যাসত্য যাচাইয়ের ভার পুলিশের বিশেষ শাখার। তারা যেকোনো অজুহাতে একজন আবেদনকারীকে থামিয়ে দিতে পারেন।

পাসপোর্টের আবেদন নিয়ে বিড়ম্বনায় আছেন এমন অন্তত ১০ জনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা অতিরিক্ত অর্থ খরচ করে ঢাকায় পুলিশি ছাড়পত্র পাওয়ার জন্য চেষ্টা চালাচ্ছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলছেন, ‘বিদেশে থাকি। পুলিশের বিরুদ্ধে এসব বলে কোন বিপদে পড়তে হয় আবার।’ 

জ্যামাইকায় বসবাসরত একজন ট্যাক্সিক্যাব চালক বলেন, তিনি প্রায় এক বছর আগে পাসপোর্টের আবেদন করেছেন। জরুরি পাসপোর্টের জন্য তার কাছ থেকে ফি নেওয়া হয়েছে সরকার নির্ধারিত ২২০ মার্কিন ডলার। পাসপোর্ট দেওয়ার কথা ২০ কর্মদিবসে। তিনি যতবার কনস্যুলেট জেনারেলের অফিসে যোগাযোগ করেছেন, তাকে বলা হয়েছে পুলিশ ছাড়পত্র না পাওয়ায় তার পাসপোর্ট দেওয়া যাচ্ছে না। 

ওই ক্যাবচালক বলেন, ‘কনস্যুলেট অফিস আমাকে পুলিশি ছাড়পত্র সংগ্রহ করতে বলে। দেখেন অবস্থা। আমি ফি দিলাম। থাকি এখানে। আমি নাকি বাংলাদেশ থেকে পুলিশি ছাড়পত্র তাদের এনে দিতাম।’
 
এই ট্যাক্সিক্যাব চালকের মতো পরিস্থিতির শিকার ব্রুকলিনের এক ব্যবসায়ীর। তিনি ৬ মাস আগে পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেছেন। নির্ধারিত সময়ে না পেয়ে অতিসম্প্রতি বাংলাদেশে পুলিশের ছাড়পত্র নেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। এ জন্য পুলিশকে দিতে হয়েছে ২০ হাজার টাকা। যিনি পুলিশ-পাসপোর্ট অফিস দৌঁড়াদৌড়ি করেছেন তাকে দিতে হয়েছে ১০ হাজার টাকা। শীঘ্রই পাসপোর্ট পেয়ে যাবেন বলে আশাবাদ করছেন তিনি। 

ফ্লোরিডা থেকে পাসপোর্টের জন্য এক আবেদনকারী বলেন, প্রায় দু’ বছর তার আবেদন ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। প্রয়োজন ছিল না বলে তিনিও গা করছিলেন না। হঠাৎ করে নিজের মায়ের অসুস্থতার জন্য বাংলাদেশে যাওয়ার প্রয়োজন হলে তিনি পাসপোর্ট পেতে যোগাযোগ করেন কনস্যুলেট জেনারেলের অফিসে। এই আবেদনকারী বলেন, ‘কনস্যুলেট অফিসের এক কর্মকর্তা আমাকে বললেন, আপনার পাসপোর্ট তৈরি হয়নি। ঢাকা পুলিশের ছাড়পত্র পেতে হবে আমাদের।’ 

এরপর ফ্লোরিডার এই আবেদনকারী ঢাকায় যোগাযোগ শুরু করেন। আবেদন দেরি হয়ে যাওয়ায় ঘাটে ঘাটে পয়সা দিয়ে এক সপ্তাহের মধ্যে পুলিশের ছাড়পত্র সংগ্রহ করেন। খরচ কত করলেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, ‘দালালে চাইছে ৫০ হাজার। আমি দিয়েছি ৪০ হাজার টাকা। তারপরও যে প্রয়োজনের সময় পেয়েছি সেটিই বড়কথা।’ 

আমেরিকায় সাধারণ পাসপোর্ট আবেদনে ফি নেওয়া হয় ১১০ ডলার। নিউইয়র্ক কনস্যুলেট জেনারেলের ওয়েবসাইটে এই তথ্য দিয়ে বলা আছে, আনুমানিক ৩৫ কর্মদিবসে পাসপোর্ট ডেলিভারি দেওয়া হবে। জরুরি পাসপোর্ট পেতে ফি দিতে হবে ২২০ ডলার, সময় লাগবে ২০ কর্মদিবস। ঘোষিত এই সময়ের মধ্যে পাসপোর্ট পেয়েছেন খুব কম আবেদনকারী। তাদের এই বিড়ম্বনার কথা শোনারও কেউ নেই। কনস্যুলেট জেনারেলের অফিসে টেলিফোন করলে জবাব একটাই, ‘পুলিশ ক্লিয়ারেন্স আসেনি।’

পুলিশি ছাড়পত্রের ধরন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। অনেকে বলছেন, দেশে থাকা আবেদনকারী আর প্রবাসী আবেদনকারীর পুলিশি ছাড়পত্র একই কায়দায় কেন তৈরি করতে হবে? যিনি দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকেন, তাকে কেন পুলিশি ছাড়পত্র নিতে হবে সেটি বোধগম্য নয়। সরকার চাইলে এ প্রক্রিয়া আরো সহজ করে পাসপোর্ট পাওয়ার পথ সুগম করতে পারে। সূত্র : প্রথম আলো।

মাইগ্রেশননিউজবিডি.কম/সাদেক ##

share this news to friends