রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে অভিযোগ নিষ্পত্তিতে উদ্যোগী বিএমইটি

সৌদি আরব, ইরাক, ওমান, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মী পাঠানোর পর রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে ওঠা নির্যাতিতদের (নারী-পুরুষ) অভিযোগ ছয় পদ্ধতিতে গ্রহণ করে তা দ্রুত নিষ্পত্তি করা হচ্ছে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) নতুন এই পদ্ধতিতে  অভিযোগগুলো নিষ্পত্তির কার্যক্রম শুরু করায় কর্মীদের ক্ষতিপূরণ আদায়ের পরিমাণ বাড়ার পাশাপাশি মামলা নিষ্পত্তির সংখ্যাও বাড়ছে।
 
এদিকে, যেসব রিক্রুটিং এজেন্সি নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা করছে না, ওই সব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কারণ দর্শাও নোটিশ পাঠানো, সার্ভার বন্ধ রাখাসহ নানা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

বিএমইটি’র পরিচালক (কর্মসংস্থান) উপসচিব ডি এম আতিকুর রহমান এ প্রসঙ্গে গণমাধ্যমকে বলেন, যেসব রিক্রুটিং এজেন্সির পাঠানো শ্রমিকেরা বিদেশে গিয়ে সমস্যার মধ্যে আছেন তাদের অভিযোগগুলো আগে শুধু লিখিত আকারে জমা হতো; কিন্তু এখন দেশে এবং বিদেশের যেকোনো স্থান থেকেই শ্রমিকদের অভিযোগ আমরা লিখিতসহ মোট ছয় পদ্ধতিতে গ্রহণ করছি। এর মধ্যে ই-মেইল, গ্রুপ ফেসবুক, প্রবাস বন্ধু কল সেন্টার, মোবাইল এসএমএস এবং টেলিফোন। পরে অভিযোগ নিষ্পত্তি করতে বিএমইটিতে উভয়পক্ষের উপস্থিতিতে প্রতি সোমবার গণশুনানি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। 

অভিযোগের কেস স্টাডি শুনে কোনোটির তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আবার শুনানি শেষে বিদেশে প্রকৃত কর্মী নির্যাতিত হচ্ছে অথবা নির্যাতিত হয়ে ফিরে এসেছে এমন প্রমাণসাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে কারণ দর্শাও নোটিশ পাঠানো হয়। তবে এখন প্রতিটি অভিযোগ আমরা সর্বোচ্চ তিন মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করে ফেলছি বলে জানান তিনি।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নারী কর্মীদের সুরক্ষা এবং নিরাপদ অভিবাসনের জন্য আমাদের মাননীয় মন্ত্রী এবং সচিব মহোদয়ের নির্দেশনায় অভিযোগ ব্যবস্থাপনায় এখন ব্যাপক ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, যে দেশ থেকে কর্মীর নামে অভিযোগ আসছে সেই দেশে থাকা দূতাবাসের কাউন্সেলরের কাছে আমরা ই-মেইল করছি।

ছয় পদ্ধতিতে অভিযোগের আবেদন গ্রহণ করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা অভিযোগ পাওয়ার পর ‘কেস ডায়েরি’ নামে একটি ফাইল খুলছি। সংশ্লিষ্ট এজেন্সির কাছে নোটিশ পাঠানোর পরও অনেক সময় রিক্রুটিং এজেন্সি চিঠি পায়নি বলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এখন নতুন নিয়মে ডেস্ক অফিসার ওই এজেন্সিকে অভিযোগের চিঠি পাওয়া-না-পাওয়ার বিষয় সরাসরি টেলিফোন করে জানিয়ে দিচ্ছে। এরপরও যারা বিষয়টি আমলে না নেওয়ার চেষ্টা করছে তাদের সার্ভার লক করা হচ্ছে। বর্তমানে আল ইত্তেসাল এয়ার লিমিটেডসহ (আরএল-৭০৭) ১২-১৩টি রিক্রুটিং এজেন্সি সার্ভার লক করা আছে।

বিএমইটি’র পরিসংখ্যান ঘেঁটে জানা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগষ্ট মাস পর্যন্ত ৮ মাসে প্রতারিত ও নির্যাতিত শ্রমিকেরা যেসব অভিযোগ জমা দিয়েছেন, তার মধ্যে কর্মসংস্থান শাখার কর্মকর্তারা তদন্ত করে মোট ৪৯৪টি অভিযোগের নিষ্পত্তি করেছেন। এ সময় রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ বাবদ ২ কোটি ৬৫ লাখ ৭৮ হাজার টাকা আদায় করা হয়েছে, যা বিগত কয়েক বছরের তুলনায় ক্ষতিপূরণ আদায় ও নিষ্পত্তি অনেক বেশি বলে কর্মকর্তারা জানান।

বিএমইটি’র ঊর্ধ্বতন পরিসংখ্যান কর্মকর্তা মো: মাসুদ রানা এ প্রসঙ্গে জানান, চলতি সেপ্টেম্বর মাসের ১২ তারিখ পর্যন্ত ৫৪টি অভিযোগ জনশক্তি ব্যুরোতে জমা পড়েছে। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে ২৫টি অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয়। একইভাবে গত আগস্ট মাসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা কর্মীদের নামে মোট ১১৮টি অভিযোগ জমা পড়ে। শুনানি শেষে ৭৯টি মামলা নিষ্পত্তি করা হয়েছে। 

তিনি বলেন, কর্মসংস্থান শাখার দৈনিক প্রাপ্ত অভিযোগের আবেদনগুলোর ওপর গৃিহত ব্যবস্থার একটি প্রতিবেদনের চিত্র বিএমইটি মহাপরিচালকের কাছে পাঠানো হয়। এতে অভিযোগকারীর নাম, কর্মীর নাম ও পাসপোর্ট নম্বর, অভিযোগে উল্লিখিত রিক্রুটিং এজেন্সির নাম, লাইসেন্স নম্বর, অভিযোগের বিষয়বস্তু, ডেস্ক কর্মকর্তার নাম-পদবি, তদন্তকারী কর্মকর্তার নাম ও গৃহিত কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে সেটিও উল্লেখ থাকছে প্রতিবেদনে।

মহাপরিচালকের কাছে পাঠানো প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত ৮ সেপ্টেম্বর রিক্রুটিং এজেন্সি আল নাহিন ম্যানপাওয়ার (লাইসেন্স নম্বর-১২৫৮)-এর বিরুদ্ধে ইরাকের কারাগারে আটক শ্রমিক আব্দুল কুদ্দুসকে দেশে ফেরত আনার জন্য আবেদন করেন অভিযোগকারী মোসা. ফরিদা বেগম। তার এই অভিযোগের তদন্ত করছেন ঊর্ধ্বতন পরিসংখ্যান কর্মকর্তা মো: মাসুদ রানা। তাকে আগামী ৯ অক্টোবরের মধ্যে অভিযোগটি তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন দাখিল করার জন্য তদন্ত কর্মকর্তাকে পত্র দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।

শুধু আল নাহিন ম্যানপাওয়ার রিক্রুটিং এজেন্সি নয়, অভিযোগ জমা পড়েছে দি উইনার ইন্টারন্যাশনাল, নার্সিসাস, মক্কা-মদিনা ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, মৃধা ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন, ন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সি, দি গাজীপুর এয়ার ইন্টারন্যাশনাল, বিজনেস এল্যায়েন্স, অ্যারাবিয়ান প্লেসমেন্ট, আল ফাতিন ইন্টারন্যাশনাল, আল মোবারক ইন্টারন্যাশনাল, আমার দেশ, আল ইমরান ইন্টারন্যাশনাল, মজুমদার ওভারসিজ, মেরিডিয়ান ইন্টারন্যাশনাল প্রা. লি., মাশাআল্লাহ ওভারসিজ, এম এইচ ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, কামাল ইন্টারন্যাশনাল, রোজভেল্ট ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, সোনার বাংলা কৃষি খামার, গডগিফট ইন্টারন্যাশনাল এবং ট্রাভেল কেয়ার প্রাইভেট লিমিটেডসহ অনেক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়েছে।

অভিযোগের আবেদন জমা পড়ার পর কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছেÑ এমন প্রশ্নের উত্তরে ডি এম আতিকুর রহমান বলেন, ব্যুরো থেকে আমরা এখন সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের ফলে ক্ষতিপূরণ এবং মামলা নিষ্পত্তি বাড়ছে। একই সাথে কর্মীদের ভোগান্তিও কমেছে। এনজিওদের কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি শুধু বলেন, এনজিওগুলো যদি সঠিক তথ্য দিয়ে অভিযোগ জমা দেয় তাহলে আমাদের পক্ষে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

মাইগ্রেশননিউজবিডি.কম/এসআর ##

share this news to friends