পাসপোর্ট ‘দুর্বল’ হলেও অভিবাসনে ষষ্ঠ বাংলাদেশ!
ছবি : ফাইল।

গ্রহণযোগ্যতার বিচারে বাংলাদেশি পাসপোর্ট ‘অপাঙক্তেয়’ হলেও বিশ্বব্যাপী এদেশীয় কর্মীদের চাহিদা ও অবস্থান ঈর্ষা করার মতো। এ পাসপোর্টে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে বিশ্বের অনেক বিমানবন্দরেই। বিমানবন্দর থেকে ফেরত পাঠানোর ঘটনাও ঘটছে। তারপরও অভিবাসনের শীর্ষ দশ দেশের মধ্যে রয়েছে লাল-সবুজের বাংলাদেশ। 
 
গত ১৮ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্ক বিভাগ অভিবাসন নিয়ে যে হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যায় অভিবাসী হওয়ার ঢলে সারা বিশ্বে বাংলাদেশিদের অবস্থান ষষ্ঠ। ২০১৯ সালে এসে বাংলাদেশের ৭৮ লাখ মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাস করছেন। তাদের বেশির ভাগই জীবিকার তাগিদে শ্রমিক হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অস্থায়ীভাবে অভিবাসন নিয়েছেন। আবার কেউ উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত দেশে স্থায়ী অভিবাসী হয়েছেন। তিন দশকের ব্যবধানে বাংলাদেশি অভিবাসীর সংখ্যা ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এভাবেই বছরের পর বছর এ দেশের লাখ লাখ মানুষ জীবিকার তাগিদে ও ভালো থাকার আকাক্সক্ষায় দেশান্তরী হয়েছেন। 

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক নাগরিকত্ব ও পরিকল্পনা বিষয়ক ফার্ম ‘হ্যানলি অ্যান্ড পার্টনার্স’ এর সর্বশেষ র‌্যাংকিং অনুযায়ী, বিশ্বের ১৯৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশি পাসপোর্টের অবস্থান এখন ৯৭তম। তার মানে বাংলাদেশি পাসপোর্ট এখনো ‘দুর্বল’। আর দুর্বল পাসপোর্টের কারণে প্রতিনিয়তই বিভিন্ন বিমানবন্দরে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে বাংলাদেশীদের। বিদ্যমান বাস্তবতা মোকাবিলা করেই বাংলাদেশীরা বিদেশে যাচ্ছে।

কেউ শিক্ষার উদ্দেশ্যে, কেউ আবার কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে নিজ দেশ ছেড়ে অভিবাসী হচ্ছে। কেউ আবার দেশ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে দারিদ্র্য, সংঘাত বা কাজের সুযোগ না পেয়ে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অভিবাসনের মূল কারণ কর্মসংস্থান বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, নিজ দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ না পেয়ে অথবা কাক্সিক্ষত পারিশ্রমিকের অভাবেই মূলত দেশ ছেড়ে অভিবাসী হচ্ছে এসব মানুষ। এর বাইরে আরো কারণ থাকলেও সেগুলো প্রধান নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, আর্থিক সচ্ছলতার উদ্দেশ্যেই মূলত মানুষ অভিবাসী হয়। ভারত ও বাংলাদেশের বিপুল জনসংখ্যাও অধিক অভিবাসনের কারণ। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা নেটওয়ার্কও অধিক অভিবাসনের ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে। কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, সিলেটের মতো জেলার মানুষ অনেক আগে থেকেই অভিবাসী। নেটওয়ার্কের কারণে এসব জেলা থেকে অভিবাসনও বেশি হচ্ছে। 

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা তরুণদের পছন্দমতো কাজ দিতে পারছি না, তাই তারা শ্রমিক হিসেবে বিদেশে যাচ্ছেন। এদিকে দেশের উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান কমে গেছে। শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি। দেশে যারা পছন্দমতো কাজ পাচ্ছেন না, বিদেশে গিয়ে তারাই রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছেন।’ মির্জ্জা আজিজের মতে, যেসব পরিবার থেকে তরুণেরা বিদেশে যাচ্ছেন, সেসব পরিবার দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠে যাচ্ছে, তারা রেমিট্যান্স না পাঠালে হয়তো ওই সব পরিবারের অবস্থার পরিবর্তন হতো না।

অল্প বয়সে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা বাংলাদেশে বেড়ে গেছে। জাতিসংঘ বলছে, বর্তমানে বাংলাদেশি অভিবাসীদের গড় বয়স ৩০ বছর। ৯ বছর আগে অর্থাৎ ২০১০ সালে বাংলাদেশি অভিবাসীদের গড় বয়স ছিল ৩৪ বছরের বেশি। এর মানে, এ দেশে তরুণ-তরুণীরা পছন্দমতো কাজের সুযোগ না পেয়ে অল্প বয়সে শ্রমিক হিসেবে বিদেশ চলে যাচ্ছেন। 
জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নব্বইয়ের দশকে বছরে গড়ে আট লাখের মতো বাংলাদেশি কাজের জন্য বিদেশে যেতো। এখন তা বেড়ে ২১ লাখে উন্নীত হয়েছে। বিদেশে যত বাংলাদেশি অভিবাসী আছে, তাদের দু’-তৃতীয়াংশের বয়স ২০ থেকে ৬৪ বছর। তারা কর্মক্ষম। তারা কমবেশি সবাই দেশে রেমিট্যান্স পাঠায়।

বিদেশে যারা যান, তাদের বেশির ভাগই অদক্ষ শ্রমিক। তাই দক্ষ ও বিশেষজ্ঞ লোক পাঠানোর পক্ষে মত দেন এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম। এ বিষয়ে তিনি একটি উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, রাজীব গান্ধী যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তখন তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষায় শিক্ষিত বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী কাজের জন্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যের মতো দেশে চলে যাচ্ছিলেন। তখন রাজীব গান্ধীকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, মেধাবীরা দেশের বাইরে চলে গেলে দেশের ক্ষতি হবে। রাজীব গান্ধীর উত্তর ছিল, ‘এটি আমি সঞ্চয়ী আমানতে অর্থ রাখছি। ভবিষ্যতে এটি মুনাফা দেবে।’ তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ওই সব ভারতীয় বিশেষজ্ঞ ইউরোপ আমেরিকা থেকে অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে ফিরে আসেন। গড়ে তোলেন বেঙ্গালুরু সফটওয়্যার শিল্প। বেঙ্গালুরু এখন শুধু ভারতের নয়, এই অঞ্চলের তথ্যপ্রযুক্তির রাজধানী।

বাংলাদেশিরা শুধু অভিবাসী হন না, বাংলাদেশেও বিদেশিরা আসেন। মিয়ানমার থেকে বিশাল রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাস্তুচ্যুত হয়ে শরণার্থী হিসেবে বাংলাদেশে বসবাস করছে। জাতিসংঘের হিসাবে, এমন শরণার্থীরা সংখ্যা এখন ৯ লাখ ৩২ হাজার। নব্বইয়ের দশকে এই সংখ্যা এক লাখের কম ছিল। শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ দ্বিতীয় স্থানে আছে। শীর্ষে আছে পাকিস্তান। পাকিস্তানে প্রায় ১৪ লাখ শরণার্থী আছে।

জাতিসংঘের সমীক্ষায় দেখা যায়, এই বছর বিশ্বজুড়ে অভিবাসীর সংখ্যা ২৭ কোটি ২০ লাখ। এই প্রতিবেদনে একদেশে জন্মগ্রহণ করে অন্যদেশে স্থায়ীভাবে বসবাসকারীদের সংখ্যা তুলে ধরা হয়। এতে দেখা যায়, বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ অভিবাসীই ১০টি দেশ থেকে এসেছে। 
জাতিসংঘ জানায়, বিদেশে বসবাসরত ১ কোটি ৮০ লাখ অভিবাসী নিয়ে এর শীর্ষে রয়েছে ভারত। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে মেক্সিকানরা, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মেক্সিকান অভিবাসী ১২ কোটি। তৃতীয় স্থানে থাকা চীনা অভিবাসী ১১ কোটি। রুশ ফেডারেশনের অভিবাসী ১০ কোটি ও সিরিয়ান আরব রিপাবলিকের অভিবাসী ৮ কোটি। সপ্তম স্থানে থাকা পাকিস্তানের অভিবাসী ৬৩ লাখ, ইউক্রেনের ৫৯ লাখ, ফিলিপাইনের ৫৪ লাখ এবং আফগানিস্তানের অভিবাসী রয়েছে ৫১ লাখ।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৯ সালে সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক অভিবাসীকে স্বাগত জানিয়েছে ইউরোপ (৮২ লাখ), দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে উত্তর আমেরিকা (৫৯ লাখ) এবং তৃতীয় স্থানে আছে পশ্চিম এশিয়া (৪৯ লাখ)।

এদিকে দেশভিত্তিতে বিশ্বের মোট অভিবাসীর অর্ধেকই রয়েছে দশটি দেশে। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি অভিবাসী রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে ( ৫ কোটি ১০ লাখ), যা বিশ্বের মোট অভিবাসীর ১৯ ভাগ। দ্বিতীয় স্থানে আছে জার্মানি ও সৌদিআরব (১ কোটি ৩০ লাখ), তৃতীয় স্থানে রয়েছে রাশিয়া (১ কোটি ২ লাখ), চতুর্থ যুক্তরাজ্য (১ কোটি), পঞ্চম সংযুক্ত আরব আমিরাত (৯০ লাখ), ষষ্ঠ স্থানে আছে ফ্রান্স, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া (৮ কোটি) এবং ইতালি আছে দশম স্থানে (৬ কোটি)।

এদিকে, অভিবাসী সংখ্যার মতো রেমিট্যান্স (বিদেশি আয়) আহরণেও বাংলাদেশ শীর্ষ দশে অবস্থান অটুট রেখেছে। চলতি বছরের এপ্রিলে বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত অভিবাসন ও রেমিট্যান্স বিষয়ক সর্বশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০১৮ সালে রেমিট্যান্স আহরণে শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৯ নম্বরে। প্রায় ৭৯ বিলিয়ন ডলার আয় করে বিশ্বে এক নম্বরে রয়েছে পাশের দেশ ভারত। আর দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে রেমিট্যান্স আহরণে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। ২১ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আয় করে দক্ষিণ এশিয়ার তালিকায় দ্বিতীয় নম্বরে রয়েছে পাকিস্তান। 

বিশ্বব্যাংকের তথ্য মতে, ২০১৮ সালে বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশ থেকে ১৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আয় করেছে। আগের বছর ১৩ বিলিয়ন ডলার আয় করেও একই অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ। রেমিট্যান্স আয়ের পরিমাণ বিবেচনায় বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় তিন নম্বরে থাকলেও জিডিপির অনুপাতে রেমিট্যান্স আহরণে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। জিডিপির ২৮ শতাংশ রেমিট্যান্স আহরণ করে নেপালের অবস্থান শীর্ষে রয়েছে। পরের অবস্থানে রয়েছে শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান।

মাইগ্রেশননিউজবিডি.কম/সাদেক ##

share this news to friends