প্রণোদনায় রেমিট্যান্সে ১৬.৫৮% প্রবৃদ্ধি!

প্রণোদনার ফলাফল হিসেবে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে সুবাতাস বইছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) তিন মাসে সাড়ে ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি (প্রায় ৩৮ হাজার ১০৯ কোটি টাকা) রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানকারী বাংলাদেশি শ্রমিক-পেশাজীবিরা। এই অংক গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ বেশি। আর সদ্য সমাপ্ত সেপ্টেম্বর মাসে রেমিট্যান্স বেড়েছে ২৯ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

প্রতি বছর দু’ ঈদের পর রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যায়। আগস্টে পবিত্র ঈদুল আযহা তথা কুরবানির ঈদের পর ধারনা করা হয়েছিল সেপ্টেম্বরে প্রবাসীরা কম রেমিট্যান্স পাঠাবেন। কিন্তু এবার তেমন হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, বিদায়ী সেপ্টেম্বরে ১৪৬ কোটি ৮৪ লাখ মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। যা মাসের হিসাবে বাংলাদেশের ইতিহাসে চতুর্থ সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স।

এর আগে গত মে মাসে পবিত্র ঈদুল ফিতর তথা রোযার ঈদকে সামনে রেখে ১৭৪ কোটি ৮১ লাখ ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলেন তারা। যা ছিল মাসের হিসাবে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছিল জুলাই মাসে; ১৫৯ কোটি ৭৭ লাখ ডলার। তৃতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছিল ২০১৮ সালের মে মাসে ১৫০ কোটি ৫০ লাখ ডলার।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা মনে করছেন, ২ শতাংশ হারে প্রণোদনা, জনশক্তি রফতানি বৃদ্ধি এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ছে।

প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স প্রবাহে সুখবর দিয়ে শেষ হয় ২০১৮-’১৯ অর্থবছর। গত অর্থবছরে আগের বছরের চেয়ে ৯ দশমিক ৬০ শতাংশ বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা। ২০১৭-’১৮ অর্থবছরে রেমিট্যান্সে প্রবৃদ্ধি ছিল আরো বেশি; ১৭ দশমিক ৩২ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, গত অর্থবছরের ধারাবাহিকতায় চলতি অর্থবছরেও ভালো প্রবৃদ্ধি নিয়ে শুরু হয়েছে। সাধারণত ঈদের পর প্রবাসীরা কম রেমিট্যান্স পাঠান। কিন্তু এবার দু’ ঈদের পরও রেমিট্যান্স বেড়েছে।

“এটা খুবই ভালো খবর। প্রণোদনা দেওয়ার কারণেও রেমিট্যান্স বাড়ছে। এছাড়া বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার হয়েছে। সে সব দেশে অবস্থানকারী আমাদের প্রবাসীরা এখন বেশি মজুরি পাচ্ছেন; বেশি অর্থ দেশে পাঠাচ্ছেন।”

এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে জনশক্তি রফতানি বাড়ায় রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে জানান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, রেমিট্যান্সে প্রণোদনা দিয়ে একটি ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর ফলে প্রবাসীরা দেশে বেশি অর্থ পাঠাচ্ছেন। অর্থনীতিতে আরো বেশি অবদান রাখছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক গতকাল মঙ্গলবার (১ অক্টোবর) রেমিট্যান্সের হালনাগাদ যে তথ্য প্রকাশ করেছে তাতে দেখা যায়, ২০১৯-’২০ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ৪৫১ কোটি ০৪ লাখ (৪.৫১ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে বাংলাদেশে। গত বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে এসেছিল ৩৮৬ কোটি ৮৯ লাখ (৩.৮৬ বিলিয়ন) ডলার। এ হিসাবেই চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে রেমিট্যান্সে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ।

নতুন বাজেটে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে ২ শতাংশ হারে প্রণোদনা দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ঘোষণা অনুযায়ী, গত ১ জুলাই থেকে প্রবাসীরা ১০০ টাকা দেশে পাঠালে ২ টাকা নগদ প্রণোদনা পাওয়ার কথা। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রণোদনার অর্থ চেয়েও কোনো তহবিল এখনো পায়নি। প্রবাসী আয়ে প্রণোদনা বাবদ ৩ হাজার ৬০ কোটি টাকার তহবিল গঠনের কথা রয়েছে। শুধু যেসব প্রবাসী ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠাবেন, তারাই এ তহবিল থেকে ২ শতাংশ হারে নগদ প্রণোদনা পাবেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মত রেমিট্যান্সে এ ধরনের প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে।

তবে সরকার ঘোষিত প্রণোদনা এখনো বিতরণ শুরু না হলেও চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই দেশের ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসী আয়ে প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এ ছাড়া ডলারের বিপরীতে টাকার সামান্য অবমূল্যায়নও প্রবাসী আয় বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এর বাইরে হুন্ডি বন্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎপরতাও বৈধপথে প্রবাসী আয় বাড়াচ্ছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে এক মার্কিন ডলারের বিপরীতে ৮৩ দশমিক ৯ টাকা পাওয়া যেত, যা এখন ৮৪ দশমিক ৫ টাকায় উন্নীত হয়েছে।

এদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংক এ সংক্রান্ত একটি নীতিমালা ঘোষণা করেছে। গত ৬ আগস্ট তা প্রকাশ করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে প্রণোদনা পেতে দেড় হাজার ডলার পর্যন্ত কোন ধরনের কাগজপত্র লাগবে না।

তবে রেমিট্যান্সের পরিমাণ এই অংকের বেশি হলে প্রাপককে প্রেরকের পাসপোর্টের কপি এবং বিদেশি নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের নিয়োগপত্র অবশ্যই জমা দিতে হবে। আর ব্যবসায়ী ব্যক্তির ক্ষেত্রে ব্যবসায়ের লাইসেন্সের কপি দাখিল করতে হবে।

গত ২০১৮-’১৯ অর্থবছরে ১ হাজার ৬৪১ কোটি ৯৬ লাখ (১৬.৪২ বিলিয়ন) ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা।

এই অংক আগের অর্থবছরের (২০১৭-’১৮) চেয়ে ৯ দশমিক ৬ শতাংশ এবং অতীতের যে কোন বছরের চেয়ে বেশি। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কখনই এক বছরে এই পরিমাণ রেমিট্যান্স আসেনি।

২০১৭-’১৮ অর্থবছরে ১ হাজার ৪৯৮ কোটি ১৭ লাখ (১৪.৯৮ বিলিয়ন) ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানকারী প্রবাসীরা। ওই অঙ্ক ২০১৬-’১৭ অর্থবছরের চেয়ে ১৭ দশমিক ৩২ শতাংশ বেশি ছিল।

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হল বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থ বা রেমিট্যান্স। বর্তমানে প্রায় সোয়া কোটি বাংলাদেশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন। জিডিপিতে তাদের পাঠানো অর্থের অবদান ১২ শতাংশের মত।

মাইগ্রেশননিউজবিডি.কম/সাদেক ##

share this news to friends