‘মৃত্যুপুরী’ দ. আফ্রিকা, চার বছরে ৪ শতাধিক বাংলাদেশি খুন

দক্ষিণ আফ্রিকা বাংলাদেশি অভিবাসীদের জন্য যেন ‘মৃত্যুপুরী’। শান্তিকামী বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য দেশটির কৃষ্ণাঙ্গ সন্ত্রাসীরা যেন ‘সাক্ষাৎ আজরাইল’। গত চার বছরে ৪ শতাধিক বাংলাদেশিকে হত্যা করা হয়েছে। জীবন হাতের মুঠোয় নিয়েই দেশটিতে অবস্থান করছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। মৃত্যু আতঙ্ক পিছু ছাড়ছে না তাদের।

এমন তথ্যই জানিয়েছেন খোদ দেশটিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সাব্বির আহমেদ চৌধুরী। তিনি বলেন, ব্যবসা ও টাকা নিয়ে বিরোধ, বিয়েবহির্ভূত সম্পর্ক, ব্যক্তিগত বিবাদ ইত্যাদি কারণে এসব হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছে। এসব খুনের শিকার বাংলাদেশিদের একটি বড় অংশ ২০ থেকে ৩০ বছরের তরুণ। 

তবে নিহত অনেকের পরিবার মৃত্যুর বিষয় জানান না বলে প্রকৃত সংখ্যা আরো অনেক বেশি হতে পারে বলে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানান তিনি। বিবাদ মেটাতে বেশিরভাগ বাংলাদেশী ‘স্থানীয় গুন্ডা ভাড়া’ করেন বলেও জানান রাষ্ট্রদূত।

সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় বিদেশি শ্রমিকদের উপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশিদের দোকানেও হামলা হয়েছে। বাংলাদেশের ঠিক কতজন নাগরিক প্রবাসে আছেন তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন জনশক্তি, কর্মসংন্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) হিসাবে ১৯৭৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত এক কোটি ২৬ লাখ মানুষ কর্মসংস্থানের জন্য দেশের বাইরে পাড়ি জমিয়েছেন। তবে কতজন ফিরে এসেছেন সেই পরিসংখ্যান নেই সরকারি এ দফতরটিতে। 

খলিল মিয়া নামে এক অভিবাসী বাংলাদেশি জানিয়েছেন, স্থানীয়রা তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে থাকে। যদিও আমরা তাদের চাকরি নিচ্ছি না, তবুও তারা আমাদের বন্দুক নিয়ে হামলা করে।

জোহানেসবার্গে প্রবাসী বাংলাদেশিদের নেতা আব্দুল আওয়াল তানসেন বলেন, “অনেক বাংলাদেশিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। কিন্তু বিচার চাওয়া তো দূরের কথা, আমরা সেগুলো কাউকে জানাইনি, কারণ, আমাদের অনেকেই এখানে অবৈধভাবে বাস করছেন।”

চলতি শতকের শুরুর দিকে দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশীদের অভিবাসন শুরু হয়। এখন প্রায় তিন লাখ বাংলাদেশি সে দেশে বাস করছেন। তাদের অনেকেই অবৈধভাবে আছেন। অনেক বাংলাদেশি মুদি দোকান দিয়েছেন।

দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশের দূতাবাস জানিয়েছে, চলতি বছর এখন পর্যন্ত ৮৮ জন বাংলাদেশির লাশ দেশে পাঠানো হয়েছে। ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে সংখ্যাটি মোট ৪৫২। এখানে যারা মারা গেছেন তাদের প্রায় ৯৫ শতাংশই হত্যার শিকার হয়েছেন। গত বছর দেশটিতে অন্তত ১৫০ জন বাংলাদেশি খুনের ঘটনা ঘটে। অনেককেই তাদের দোকানে গুলি করা হয়েছে বলে জানান দূতাবাসের এক কর্মকর্তা।

এদিকে প্রবাসী ও গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রতি বছর গড়ে ২শ’ বাংলাদেশি হত্যাকান্ডের শিকার হচ্ছেন। গত বছর হত্যাকান্ডের পাশাপাশি গুলিবিদ্ধ হয়ে পঙ্গু হয়েছেন ৫৬ বাংলাদেশি। অপহরণের ঘটনা ঘটেছে ১৮টি। দোকানে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে ৫৩৩টি।

গত দু’ বছরে দেশটিতে শুধু শরীয়তপুরেরই অন্তত ১০ যুবক খুন হন। জনশক্তি রফতানিকারকরা বলছেন, বৈধভাবে দক্ষিণ আফ্রিকায় যাওয়ার সুযোগ খুব কম হলেও এক শ্রেণির দালাল ৬-৭ লাখ টাকা নিয়ে মোজাম্বিক, জাম্বিয়া, তানজানিয়া, লাইবেরিয়াসহ বিভিন্ন দেশ হয়ে অবৈধভাবে দক্ষিণ আফ্রিকায় লোক পাঠায়।

এ প্রক্রিয়ায় যারা দেশটিতে যান, তাদের বেশির ভাগেরই বাড়ি নোয়াখালী, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, কুমিল্লা, মুন্সীগঞ্জ ও শরীয়তপুরে। তাদের বেশির ভাগই সেখানে দোকান চালান।

কিন্তু বৈধ নন, ফলে তাদের ব্যাংক হিসাবও নেই। যে কারণে নিজেদের কাছেই তারা নগদ টাকা রাখেন। আর ওই টাকা ছিনিয়ে নিতেই কৃষ্ণাঙ্গরা এসব হামলা চালায়।

দক্ষিণ আফ্রিকার বাংলাদেশ হাইকমিশন বলছে, দক্ষিণ আফ্রিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে বিষয়টি জানানো হয়েছে। তাদের কাছে এসব ঘটনার প্রতিকার ও ন্যায়বিচার চাওয়া হয়েছে। বাংলাদেশি খুনের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের চিহ্নিত করারও অনুরোধ জানানো হয়েছে।

প্রবাসীরা বলছেন, দেশটিতে জীবন হারানোর শঙ্কা নিয়ে চলতে হয়। অন্য দেশের কেউ মারা গেলে সে দেশের দূতাবাস মামলা করে, কিন্তু বাংলাদেশিদের ঘটনায় কেউ এগিয়ে আসে না।

দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসরত বাংলাদেশিদের অভিযোগ, হত্যাকান্ডের শিকারের পর পুলিশের পক্ষে একটি অস্বাভাবিক মৃত্যু (ইউডি) মামলা ছাড়া ভুক্তভোগীর পক্ষে কোনো মামলা হয় না। তাই খুনের ঘটনার কারণ নিয়ে তদন্তও হয় না। কী কারণে এ হত্যাকান্ডটি সংঘটিত হয়েছে তা পুলিশি তদন্তের বাইরেই থেকে যায়।

অথচ অন্য কোনো দেশের নাগরিক সেখানে হত্যাকান্ডের শিকার হলে ওই দেশের কমিউনিটি নেতারা সংশ্লিষ্ট থানায় অজ্ঞাত আসামির নামে মামলা করেন। মামলার চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত ওই মামলার তদারকিও করে যান।

এমনকি ওই দেশের দূতাবাস পর্যন্ত মামলার তদারকির জন্য নিজস্ব আইনজীবী নিয়োগ করে থাকেন। বাংলাদেশি প্রবাসীদের বেলায় ঘটে উল্টো। 

যেকোনো এলাকায় কোনো বাংলাদেশি নাগরিক হত্যাকান্ডের শিকার হলে স্থানীয় বাংলাদেশিরা চাঁদা তুলে লাশ কোনোরকমে দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কমিউনিটির কোনো নেতা একটি লাশের তদারকি বা বাদি হয়ে মামলাও করে না।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে বাংলাদেশের শ্রমচুক্তি না থাকায় এবং যারা হত্যাকান্ডের শিকার হচ্ছেন, তাদের প্রায় সবাই ভ্রমণ ভিসা বা চোরাইপথে গিয়ে সেখানে থেকে যাওয়ার ফলে কেউ নিহত হলেও মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকছে না।

মাইগ্রেশননিউজবিডি.কম/এসআর ##

share this news to friends