‘ফাইনাল এক্সিট’ দিয়েছে সৌদি শ্রম আদালত, সুমির দেশে ফেরা যেকোন সময়

সৌদি আরবে নির্যাতনের শিকার গৃহকর্মী সুমি আক্তারকে (২৬) দেশে ফেরার ‘ফাইনাল এক্সিট’ দিয়েছে সৌদি আরবের শ্রম আদালত। ফলে দেশে ফিরতে আইনি আর কোনো বাধা রইলো না সুমির। আগামী সপ্তাহের মধ্যেই তিনি দেশে ফিরতে পারবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত রবিবার (১০ নভেম্বর) দেশটির নাজরান শহরের শ্রম আদালতে এ বিষয়ক এক শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। সুমি আক্তার, সৌদিতে তার নিয়োগকর্তা (কফিল) ও কনস্যুলেট প্রতিনিধি এসময় উপস্থিত ছিলেন।
 
শুনানিতে কনস্যুলেট’র আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সুমিকে ‘ফাইনাল এক্সিট’ দেওয়ার দাবি মঞ্জুর করেন শ্রম আদালত। একই সঙ্গে আদালত সুমির নিয়োগবাবদ তার নিয়োগকর্তার দাবি করা ২২ হাজার সৌদি রিয়েল পরিশোধের আবেদন নামঞ্জুর করেন। 

এর আগে সুমির নিয়োগকর্তা অর্থের বিনিময়ে তাকে ‘কিনে’ নেওয়ার দাবি জানান, এবং সৌদি আরব থেকে তার বের হওয়ার অনুমতি (এক্সিট) দিতে ২২ হাজার রিয়াল ক্ষতিপূরণ দাবি করেন। এতে করে সুমির দেশে ফেরা নিয়ে আইনি জটিলতার সৃষ্টি হয়। কিন্তু এবারে তা কেটে গেল। 

সংশ্লিষ্টরা জানান, সম্প্রতি নির্যাতনের শিকার সুমির ভিডিও বার্তা ভাইরাল হলে দূতাবাসের সহযোগিতায় তাকে উদ্ধার করে সৌদি পুলিশ। পরে জেদ্দার বাংলাদেশ দূতাবাস সৌদি শ্রম আদালতে এ বিষয়ক একটি শুনানির আয়োজন করে। 

সুমির দেশে ফেরার আইনি জটিলতা কেটে যাওয়ায় একটি চিঠি ইস্যু করেছেন জেদ্দা কনস্যুলেটের প্রথম সচিব কে এম সালাহ উদ্দিন। ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, শ্রম আদালতের নির্দেশের পর তাৎক্ষণিকভাবে সুমি আক্তারকে ‘ফাইনাল এক্সিট’ দেন তার বর্তমান নিয়োগকর্তা। এর পরিপ্রেক্ষিতে ‘ওয়েজ অর্নার্স কল্যাণ বোর্ড’র অর্থায়নে জেদ্দা কনস্যুলেটের প্রচেষ্টায় শীঘ্রই সুমিকে বাংলাদেশে পাঠানোর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে।

ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের উপ-পরিচালক জাহিদ আনোয়ার গণমাধ্যমকে বলেন, কনস্যুলেটের অনুরোধে সৌদি আরবের শ্রম আদালতের নির্দেশেই সুমির মালিক (কফিল) ফাইনাল এক্সিট দিয়েছে। তার পাসপোর্টও দিয়ে দেওয়া হয়েছে। কনস্যুলেটের কর্মকর্তারা টিকিটের খোঁজ নিচ্ছেন। টিকিট পাওয়া মাত্রই তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে।

ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান জানান, সৌদির শ্রম আদালত সুমির পক্ষে রায় দিয়েছেন। ফলে তাকে আর তার নিয়োগকর্তার দাবি করা টাকা দিতে হবে না। এখন তিনি যে কোনো দিন বাংলাদেশে আসতে পারবেন। এরই মাঝে তাকে পাসপোর্টও দেওয়া হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে আগামী সপ্তাহের মধ্যেই তিনি দেশে ফিরতে পারবেন। সুমিকে সৌদি পাঠানো বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সি ‘রূপসী বাংলা ওভারসিজ’ই তাকে বিমানে আনাসহ অন্যান্য খরচ দিচ্ছে। 

সুমির স্বামী নুরুল ইসলাম বলেন, সুমি কবে বাংলাদেশে ফিরবে, তা এখনও আমি জানি না। দূতাবাসের লোকজনদের কাছে জানতে চাইলে তারা বলে, নিদিষ্ট করে কিছু বলা যাচ্ছে না। ১০ দিনও লাগতে পারে, আবার এক মাসও লাগতে পারে। সুমির সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। সে জানিয়েছে ওখানের টাকাপয়সার ঝামেলা মিটে গেছে। তাকে পাসপোর্ট দেওয়া হয়েছে। এখন সে টিকিটের জন্য অপেক্ষা করছে। 

জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেট সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রফতানি ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর পাঠানো চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে নাজরান শহরের মালিকের বাসা থেকে সুমিকে উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীতে গত ৫ নভেম্বর জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল সুমিকে দেশে ফেরাতে ট্রাভেল এজেন্সি ‘রূপসী বাংলা ওভারসিজ’কে বিমানের টিকিটসহ ২২ হাজার রিয়াল ( বাংলাদেশি মূদ্রায় প্রায় পাঁচ লাখ টাকা) দেওয়ার নির্দেশ দিতে সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ করেন। 

চলতি বছরের ৩০ মে রিক্রুটিং এজেন্সি ‘রূপসী বাংলা ওভারসিজ’র মাধ্যমে ঢাকার হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সৌদি অ্যারাবিয়ান এয়ারলাইনস (এসভি) ৮০৫ যোগে সৌদি আরব যান আশুলিয়ার চারাবাগ এলাকার নুরুল ইসলামের স্ত্রী সুমি। সেখানে যাওয়ার পর নিয়োগকর্তা ও অন্যদের পাশবিক নির্যাতনের মুখে পড়েন তিনি। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে এক পর্যায়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভিডিওবার্তায় কান্নায় ভেঙে পড়ে দেশে ফেরার আকুতি জানান সৌদি প্রবাসী সুমি। 

ওই ভিডিওতে সুমি বলেন, ‘ওরা আমারে মাইরা ফালাইবো, আমারে দেশে ফিরাইয়া নিয়া যান। আমি আমার সন্তান ও পরিবারের কাছে ফিরতে চাই। আমাকে আমার পরিবারের কাছে নিয়া যান। আর কিছু দিন থাকলে আমি মরে যাবো।’ 

ঋয়াবহ নির্যাতনের ঘটনা শোনার পর সুমিকে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে আসার জন্য তার স্বামী নূরুল ইসলাম বাদী হয়ে তাকে সৌদিতে পাঠানো রিক্রুটিং প্রতিষ্ঠান ‘রূপসী বাংলা এজেন্সি’র মালিক আক্তার হোসেনের নামে পল্টন থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন।

সুমির পরিবার জানায়, ২০১৬ সালে সুমি আক্তারকে বিয়ে করেন নুরুল ইসলাম। সুমি পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলার রফিকুল ইসলামের মেয়ে। বিয়ের পর তিনি জানতে পারেন, আগেও একটি বিয়ে করেছেন তার স্বামী। শেষমেশ বাধ্য হয়ে সতীনের সঙ্গে সংসার শুরু করেন তিনি। বিয়ের দেড় বছর পর তার একটি সন্তানও হয়। কিন্তু সতীনের বিভিন্ন নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে ও সন্তানকে মানুষ করার স্বপ্নে বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন সুমি। 

এ উদ্দেশ্যেই চলতি বছরের জানুয়ারিতে গৃহকর্মীর প্রশিক্ষণ শেষ করেন সুমি। তাকে বিনামূল্যে সৌদি পাঠানোর লোভ দেখায় দালালেরা। শেষমেশ মে মাসে সৌদিতে পাড়ি জমান নিম্নবিত্ত ঘরের এ গৃহবধূ।

কিন্তু বিদেশে পাঠানোর কথা বলে দালালচক্র যে তাকে বিক্রি করে দিয়েছে সে কথা জানতেন না সুমি। সৌদি যাওয়ার সপ্তাহখানেক পর থেকেই তার ওপর শুরু হয় মারধর, যৌন হয়রানিসহ বিভিন্ন নির্যাতন। পরে ফেসবুকে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বিভিন্ন পাশবিক নির্যাতনের কথা বলে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ জানান সুমি। পরবর্তীতে ওই ভিডিওটি ভাইরাল হলে বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের নজরে আসে। পরে তাকে উদ্ধার করে সৌদি পুলিশ।

মাইগ্রেশননিউজবিডি.কম/সাদেক ##

share this news to friends