‘শনির দশা’ কাটছে পাকিস্তানে চ্যান্সারি কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্পের!
ছবি : কমপ্লেক্সের নকশা।- সংগৃহিত

প্রকল্পটি ছিল তিন বছরের। সংশোধনী প্রস্তাবের মাধ্যমে বার বার সময় বাড়ানোর কারণে কেটে গেছে ১৫ বছর। তারপরও শেষ হয়নি পাকিস্তানের ইসলামাবাদে ‘বাংলাদেশ চ্যান্সারি কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্প’। এখন আবার নতুন করে ব্যয় এবং মেয়াদ বাড়িয়ে তৃতীয় সংশোধনীর প্রস্তাব করা হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে। বোদ্ধামহলের প্রশ্ন, এবার প্রকল্পটির শনির দশা কাটবে তো?

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দেশটির সরকার ইসলামাবাদের কূটনৈতিক জোনে বাংলাদেশ চ্যান্সারি কমপ্লেক্স নির্মাণের জন্য ২০০৩ সালে জমি দিয়েছিল। জমি গ্রহণের পর ২০০৭ সালে কমপ্লেক্সটি নির্মাণে বাংলাদেশ সরকার প্রকল্প নিলেও এতদিন তা ঢিমেতালেই চলছিল। দ্বিতীয় সংশোধনীর পর ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত এ প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় থাকলেও হঠাৎ করেই এর তৃতীয় সংশোধনী এনে এটি বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।


সংশোধনী প্রস্তাব জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) পরবর্তী সভায় অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।


প্রকল্পের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে, ‘পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা ও তা শক্তিশালী করা; দুটো রাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক উন্নয়ন করা; বর্তমান চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে মিশনে প্রয়োজনীয় ভৌত অবকাঠামো সুবিধা সৃষ্টি এবং পাকিস্তান সরকারের বাংলাদেশ সরকারকে দূতাবাসের জন্য দেওয়া জমির সদ্ব্যবহার করা।’


সূত্র জানায়, ‘পাকিস্তানের ইসলামবাদে বাংলাদেশ চ্যান্সারি কমপ্লেক্স নির্মাণ (তৃতীয় সংশোধন)’ প্রকল্পটি বাংলাদেশ হাইকমিশন, ইসলামাবাদ বাস্তবায়ন করবে। মূল প্রকল্পে ২৯ কোটি ৮০ লাখ বরাদ্দ থাকলেও তৃতীয় সংশোধনীতে তা করা হয়েছে ৭৯ কোটি ৮৬ লাখ ৫৭ হাজার টাকা। প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২২ সালের জুনে শেষ হওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।


ইসলামাবাদের বাংলাদেশ হাইকমিশন বলছে, পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও দেশটিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের জন্য স্থায়ী নিজস্ব ভবন/কমপ্লেক্স নেই। বর্তমানে ভাড়া বাড়িতে দূতাবাসের কার্যক্রম চলছে। ২০০৩ সালে পাকিস্তান সরকার ইসলামাবাদ কূটনৈতিক জোনে বাংলাদেশ দূতাবাস নির্মাণের লক্ষ্যে জমি বরাদ্দ দেয় এবং ২০০৩ সালের ২৪ মার্চ বাংলাদেশ হাইকমিশন জমির দখলভার গ্রহণ করে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে সেখানে স্থায়ী স্থাপনা/দূতাবাস ভবন নির্মাণের লক্ষ্যে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য ৫ সদস্যের একটি দল ২০০৫ সালের ২ থেকে ৫ আগস্ট ইসলামাবাদ সফর করে বিস্তারিত প্রতিবেদন পেশ করে। ওই পরিদর্শনের ভিত্তিতে মূল প্রকল্পটি সম্পূর্ণ জিওবি অর্থায়নে মোট ২৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে ২০১০ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য ২০০৮ সালের ৩০ জানুয়ারি একনেক সভায় অনুমোদিত হয়।


পরবর্তীতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০১০ সালের ২ মে ব্যয় বৃদ্ধি ব্যতিরেকে প্রকল্পটির মেয়াদ এক বছর বাড়িয়ে ২০১১ সালের জুন পর্যন্ত করে। একইভাবে আরেকদফা মেয়াদ বাড়িয়ে ২০১৩ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়।


এদিকে, ডলারের মূল্য বৃদ্ধি, পরামর্শক চূড়ান্ত করা, স্থাপত্য ও কাঠামোগত নকশা প্রণয়ন ও ঠিকাদার নির্বাচনে বেশি সময়ের প্রয়োজন হওয়ায় এবং অনুমোদিত স্থাপত্য নকশা অনুযায়ী চ্যান্সারি কমপ্লেক্সের এরিয়া বৃদ্ধি পাওয়ায় মোট ৫১ কোটি ৭৯ লাখ ১১ হাজার টাকা ব্যয়ে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদ বাস্তবায়নের জন্য প্রথম সংশোধিত ডিপিপি ২০১৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর একনেক সভায় অনুমোদিত হয়। 


পরবর্তীতে প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজ শুরু করতে দেরি হওয়ায় বাস্তবায়ন মেয়াদকাল এবং প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধির কারণে প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধিত ডিপিপি ৬৮ কোটি ৫২ লাখ ৫৮ হাজার টাকায় ব্যয়ে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত অনুমোদন করেন পরিকল্পনামন্ত্রী।


বর্তমানে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় একক উৎস পদ্ধতিতে ওই একই প্রতিষ্ঠানকে পুনরায় নিয়োগ, প্রকল্পের আওতায় নতুনভাবে সীমানা প্রাচীর এবং ল্যান্ডস্কেপিং অঙ্গ অন্তর্ভুক্ত করা, কিছু সংখ্যক বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি নতুনভাবে অন্তর্ভুক্তি, বিদ্যমান অঙ্গের ব্যয় বৃদ্ধি, মিনি অডিটরিয়াম তৈরি এবং বাস্তবায়নের মেয়াদ ২ বছর বাড়ার কারণে প্রকল্পটি তৃতীয়বার সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়।


চ্যান্সারি কমপ্লেক্স নির্মাণ, আসবাবপত্র ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি কেনা এবং পরামর্শক ফিসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক কার্যক্রম করা হবে এই প্রকল্পের আওতায়। 


এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য শামীমা নার্গিস বলেন, ‘প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে বাংলাদেশ হাইকমিশনের নিজস্ব চ্যান্সারি কমপ্লেক্সে দাফতরিক কার্যক্রম পরিচালনা সম্ভব হবে। তাই প্রকল্পটির তৃতীয় সংশোধনী প্রস্তাব অনুমোদনযোগ্য।’


বোদ্ধামহল বলছেন, ২০০৯ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবাহী শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর পাকিস্তানের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক শিথিল হতে থাকে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান যে ভুল করেছে এখন তাকে প্রায়শ্চিত্ত করতে হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রতিটি সরকারই প্রতিবেশি রাষ্ট্রগুলোর সাথে শান্তিপূর্ণ ও সম্মানজনক সম্পর্কে বিশ্বাস করে। সেই বিবেচনায় বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক রাখা সময়ের দাবি। আর সে সম্পর্ককে দৃঢ় করতে হলে যত দ্রুত সম্ভব চ্যান্সারী ভবন নির্মাণ কাজ শেষ করতে হবে। তারা বলছেন, কোন না কোন কারনে হয়তো এতদিন ‘শনির দশা’র কবলে পড়েছিল প্রকল্পটি। নতুন মেয়াদে সে প্রতিকূলতা কেটে যাবে বলে তারা আশা করছেন।


মাইগ্রেশননিউজবিডি.কম/এসআর ##

 

share this news to friends