প্রবাসীদের প্রতি মানবিক আচরণের দাবি ৫ সংগঠনের
ছবি : ফাইল।

প্রবাসীদের প্রতি ঘৃণা নয়, মানবিক আচরনের দাবি জানিয়েছে অভিবাসীদের স্বার্থ ও অধিকার নিয়ে কাজ  করা ৫টি সংগঠন। বিদেশফেরত প্রবাসীরা দেশে করোনার বিস্তার ঘটাচ্ছেন মর্মে প্রশাসনিক বক্তব্যকে তারা হয়রানি ও মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লংঘন বলে মনে করছে তারা।


আজ শনিবার (২৮ মার্চ) ৫টি সংগঠনের এক যৌথ বিবৃতিতে এ দাবি জানানো হয়েছে। ওয়্যারবী ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ সাইফুল হক, ফিল্মস ফর পিস  ফাউন্ডেনের নির্বাহী পরিচালক  পারভেজ সিদ্দিকী, নেদারল্যান্ডভিত্তিক বাংলাদেশি অভিবাসী সংগঠন ‘বাসুজ ইন্টারন্যাশনাল’ এর চেয়ারম্যান বিকাশ চৌধুরী বড়–য়া, যুক্তরাজ্যভিত্তিক বাংলাদেশি প্রবাসী সংগঠন  ‘প্রবাসী পরিবার পরিষদ’ এর আনিসুর রহমান খান এবং ইপসা’র  নিরাপদ অভিবাসন কর্মসূচি ব্যবস্থাপক আব্দুস সবুর যৌথভাবে এ বিবৃতি দেন। 

 
বিবৃতিতে বলা হয়, “সাম্প্রতিক সময়ে কোভিড-১৯  সারা বিশ্বে মহামারি  আকার ধারণ করেছে এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গত ১১ মার্চ করোনা সংক্রমণকে ‘মহামারি’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশেও  এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে, যা দেখে আমরা উদ্বিগ্ন এবং এর ফলে মানুষের জীবন ঝুকিপূর্ণ এবং অনিরাপদ হয়ে পড়েছে। আজ বেলা আড়াইটা পর্যন্ত সারা পৃথিবীতে ৫ লাখ ৯৮ হাজার ২৪৫ জন নভেল করোনা  ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন এবং ২৭হাজার ৭৬২ জন মারা গেছেন।” 

 
বিবৃতিতে বলা হয়, “বাংলাদেশের রোগ তত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং গবেষোণা ইন্সটিটিউট (আইইডিসিআর) এর রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশে ৪৮ জন এই রোগে সংক্রমিত হয়েছেন  যার মধ্যে ৫ জন মারা গেছেন এবং আই ই  ডি সি আর ২৩ মার্চের রিপোর্ট অনুযায়ী আক্রান্তদের মধ্যে ১৩ জন প্রবাসী- যারা সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ফিরেছেন, বাকিরা এদের সংস্পর্শে এসে আক্রান্ত হয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পৃথিবীর আরও কয়েকটি দেশে বাংলাদেশি প্রবাসীরা করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন এবং কেউ কেউ মারা গিয়েছেন। অপরদিকে বাংলাদেশি প্রবাসীদের কতজন দেশে বা দেশের বাইরে কোয়ারেন্টাইনে আছেন সে সম্পর্কে কোন তথ্য আমরা এখনো জানি না।”


গভীর  উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতিতে বলা হয়, “নভেল করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে ইটালি, স্পেন-সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে হাজার হাজার বাংলাদেশি অভিবাসী চাকরি হারিয়েছেন ৷ সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিমান যোগাযোগ সীমিত/ বন্ধ হয়ে যাওয়াতে অনেকেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিমানবন্দরে আটকা পড়েছেন। করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে অনেক প্রবাসী বাংলাদেশে এসেছেন, যা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মনে নভেল করোনা ভাইরাস বিষয়ক আতংকের সৃষ্টি করেছে। বিমানবন্দরে যথাযত গাইডলাইন, সচেতনতার অভাব  এবং মনিটরিং না থাকায় অনেককে স্বেচ্ছায় গৃহবন্দী (সেলফ  কোয়ারেন্টিন) থাকার কথা বলা হলেও প্রবাসীরা যত্রতত্র ঘোরাফেরা করছেন, যা প্রবাসীদের নিজ পরিবার এবং এলাকার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।” 


এক কোটিরও বেশি বাংলাদেশি অভিবাসী প্রতিবছর ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স ব্যাংকের মাধ্যমে পাঠিয়ে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখছে উল্লেখ করে বিবৃতিতে আরও বলা হয়,  “অত্যন্ত দুঃখের সাথে আমরা লক্ষ্য করছি সরকার, নাগরিক এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে শুধু প্রবাসীরা বাংলাদেশে নভেল করোনা ভাইরাস ছড়াচ্ছেন বলে গুজব ছড়িয়েছেন যার ফলে সাধারণ মানুষের মনে এমন একটা ধারণা চলে এসেছে যে শুধু প্রবাসীরাই এই নভেল করোনা ভাইরাস বাংলাদেশে নিয়ে এসেছেন। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে প্রবাসীরা ছাড়াও সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র, কক্সবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য সহ হাজার হাজার মানুষ ব্রিটেন, সৌদি আরব সহ  বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশে এসেছেন। প্রবাসীদের মতো সংসদ সদস্য, সিলেটের মেয়র সহ অনেকে কোয়ারেন্টাইন মানছেন না। প্রবাসী না বলে সাম্প্রতিক সময়ে যারা বিদেশ থেকে দেশে এসেছেন তাদের ‘সেলফ কোয়ারেন্টিনে’ থাকার কথা বলা হলে এই ধরনের ঘৃণা ছড়াবে না বলে আমরা বিশ্বাস করি।”


অভিবাসী অধিকারকর্মীরা অভিযোগের সুরে বলেন, “কিন্তু মিডিয়া এবং সরকারী ঘোষণায় শুধু প্রবাসীদেরকেই করোনা ভাইরাস ছড়ানোর জন্য দায়ী করা হচ্ছে। যার ফলে প্রবাসীরা বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। পুলিশ প্রবাসীদের বাড়িতে লাল পতাকা দিয়ে চিহ্নিত করছে। প্রশাসন সরকারিভাবে শুধু প্রবাসীদের বের হতে নিষেধ করছেন এবং বিদেশ থেকে এসেছেন কিন্তু পাসপোর্টে উল্লিখিত ঠিকানায় থাকছেন না তাদেরকে পুলিশ সদরদফতরে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। এতে করে মনে হচ্ছে গত একমাসে অভিবাসী ছাড়া আর কেউ দেশে ফেরেননি। এর ফলে প্রবাসীরা পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে বিভিন্ন হয়রানির শিকার হচ্ছেন, যা মানবাধিকারের সুষ্পষ্ট লঙ্ঘন। এই বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় কোন রকম উদ্যোগ গ্রহণ না করায় আমরা উদ্বিগ্ন।”


বিবৃতিতে ফেরত প্রবাসীদের মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনার পাশাপাশি করোনা              মোকাবিলা এবং অভিবাসীদের এই ভাইরাস থেকে সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য ও সেবা (হ্যান্ড স্যানিটাইজার, মাস্কসহ  চিকিৎসা) নিশ্চিতের মাধ্যমে অভিবাসীদের অধিকার নিশ্চিতের দাবি জানানো হয়। 


বিবৃতিতে অধিকারকর্মীরা বলেন, “বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলেটের মাধ্যমে করোনা থেকে সুরক্ষার জন্য সচেতন  এবং প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা খুবই গুরত্বপূর্ণ। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ  গ্রহন করার জন্য অনুরোধ করছি। প্রবাসীদের প্রতি ঘৃণা নয়, মানবিক আচরণের জন্য দাবী জানাচ্ছি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে অনুরোধ করব প্রবাসীরা প্রতিনিয়ত যে সকল সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তা নিরসনে আন্তরিকভাবে সচেষ্ট হওয়ার জন্য।”


মাইগ্রেশননিউজবিডি.কম/সাদেক ##

 

share this news to friends