কভিড-১৯ : আসলেই কি সব দায় প্রবাসফেরতদের?

কভিড-১৯ (করোনা ভাইরাস ডিজিজ-২০১৯) একটি জটিল ভাইরাস। চীনের উহান শহরে এর প্রথম উৎপত্তি, বিদেশ হয়ে বা থেকে আসা যে কোন ব্যক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশে সংক্রামিত হতে পারে। এখনও এর সুনির্দিষ্ট কোন চিকিৎসা আবিস্কৃত হয় নাই। আমাদের নির্ভর করতে হয় গনসচেতনতা ও জীবনাচারের উপর। এই গনসচেতনতা ও তথ্য প্রদানে আমরা যেন অসাবধানতাবশতঃ এমন কোন তথ্য না দেই যা সমাজে একটা ভুল ম্যাসেজ চলে যায়।


কভিড-১৯ এর সাথে অতিমাত্রায় প্রবাসী বাংলাদেশি তথা অভিবাসীদের সম্পৃক্ততা খোঁজা হচ্ছে এবং সমাজে তাদের স্টিগমাইজ বা নেতিবাচক হিসাবে দেখানো হচ্ছে। একজন প্রবাসফেরত অভিবাসী ও ‘অভিবাসী অধিকারকর্মী’ হিসাবে লক্ষ্য করছি যে, সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তিবর্গ ও সংবাদ মাধ্যমের ব্যাপক (অপ)প্রচারের ফলে প্রবাসফেরত বাংলাদেশীদের নিয়ে রাষ্ট্রীয় জীবনে একটা নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে। যেমন - (১) ইতিমধ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে “প্রবাসীদের প্রবেশ নিষেধ” সাইনবোর্ডও ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে, (২) মিরপুরে মৃত করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির কোন প্রবাসী বা অভিবাসন সম্পৃক্ততা না পেয়ে প্রথমে করোনার চিকিৎসা না দিয়ে ফেরত পাঠানো হয়েছিল (তথ্যসূত্র : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের প্রফেসর রুবায়েত ফেরদৌসের সঞ্চালনায় আরটিভি টকশো’তে জনৈক ডাক্তার। যদি এই ঘটনা সত্যি হয়, তাহলে আমাদের আশংকা, একটা বিরাট অংশ করোনা নজরদারির বাইরে থেকে যাচ্ছে), (৩) এই ভাইরাস সংক্রমনের সময় আসা প্রবাসফেরত অভিবাসীদের খুঁজতে গ্রাম পর্যায়ে প্রশাসন চিরুন অভিযান চালাচ্ছে। তাদের কোন ধরনের পরীক্ষা ছাড়াই বাড়িতে লাল নিশান উড়িয়ে তাদের সামাজিকভাবে হেয় করা হচ্ছে। অথচ একই সময়ে বিদেশ হয়ে আসা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা, পর্যটক বা বিভিন্ন কারনে বিদেশ সফর করা ব্যক্তিগনও যে এই ভাইরাস বহন করতে পারেন, সেদিকে প্রশাসনের তেমন মনযোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছেনা। মনে রাখতে হবে, যে কোন ভাইরাস প্রতিরোধে  অর্ধপ্রতিরোধ কোন প্রতিরোধ নয়।

কভিড-১৯ যে সকল কারনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে, সেই একই কারনগুলো বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অর্থাৎ চীনের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য বিস্তার লাভ করেছে। চীনা পণ্যে বাংলাদেশের বাজার সয়লাব। এই বাণিজ্যিক কারনে উভয় দেশের ব্যবসায়ী ও সরকারি-বেসরকারি ব্যক্তিবর্গের অবাধ যাতায়াত। তাদের মাধ্যমেও বাংলাদেশে এই ভাইরাসের বিস্তার ঘটে থাকতে পারে।
কভিড-১৯ বাংলাদেশে বসবাসকারী এবং বিশ্বের যেকোন দেশে বসবাসকারী বাংলাদেশি উভয়ের ক্ষেত্রেই আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা সমান। ব্যতিক্রম শুধু মহামারি আকার ধারনকারী দেশগুলো। এই ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসলে, যে কোন অসচেতন মূহূর্তে অন্যরাও আক্রান্ত হতে পারেন। এজন্য কাউকে প্রবাসী বাংলাদেশি হওয়ার দরকার নেই। এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে ট্রানজিটের স্বল্প সময়েও যে কেউ কভিড-১৯ দ্বারা সংক্রমিত হতে পারেন।


কভিড-১৯ এর আলোচনায় আমাদের সকল মহলের দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। সচেতনতার নামে যেন আমরা অন্যদের জীবন-মানের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে না ফেলি। আমাদের স্বরনে রাখতে হবে, ৯০’র দশকে প্রানঘাতি এইচআইভি/এইডসকে ‘মাইগ্রেন্ট ডিজিজ’ বলে প্রবাসী ও তাদের পরিবারকে সমাজে হেয় প্রতিপন্ন করা হতো। আমার জানা এক অভিবাসিকর্মী অসুস্থ হয়ে দেশে ফেরত এলে, এইডসের রোগী বলে দীর্ঘবছর তাকে সমাজচ্যুত করে রাখা হয়েছিল। এমন কি সামাজিক অসচেতনতার কারনে কোথাও কোথাও এইচআইভি/এইডস এর রোগীকে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়েছে। এইডস রোগে মৃতের কাফন-দাফনেও বাধা দেওয়া হয়েছিল। করোনা ভাইরাসের বিস্তারে আমরা কোথাও কোথাও অতীতের আলামত লক্ষ্য করছি।


সঙ্গত কারনেই এইচআইভি/এইডস এর মত কভিড-১৯ এ অভিবাসীদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি হতেই পারে। এজন্য প্রবাসীদের বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। একমাত্র সচেতনতা ছাড়া এই ভাইরাস প্রতিরোধ করা যাবেনা। প্রয়োজনে সেলফ আইসোলেশনসহ কোয়ারেন্টিনেও যেতে হবে। কভিড-১৯ প্রতিরোধে দেশে-বিদেশে অবস্থানকারী সকল প্রবাসী বাংলাদেশীসহ সবাই নিজ নিজ সরকারের নির্দেশনা মেনে চলুন। নিজে নিরাপদ থাকুন আপনার পরিবেশ নিরাপদ রাখুন। ভাল থেকো বাংলাদেশ।     

                     
লেখক : পরিচালক, আওয়াজ ফাউন্ডেশন।


মাইগ্রেশননিউজবিডি.কম/সাদেক ##

 

share this news to friends