রেমিট্যান্সে করোনার করুণ আঘাত!

চলতি অর্থবছরের (২০২০-’২১) শুরুতে দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক নেতিবাচক ধারায় রয়েছে। আমদানি-রফতানি, ঋণ বিতরণ, রাজস্ব আদায় প্রতিমাসেই কমেছে। শুধু রেমিট্যান্স (প্রবাসী আয়) প্রবাহ ছিল ইতিবাচক ধারায়। অর্থনীতির সেই স্বস্তিদায়ক সূচকেও করোনার ভাইরাস করুণ আঘাত করেছে। শুধু মার্চ মাসেই রেমিট্যান্স প্রবাহ কমেছে ১২ শতাংশের কাছাকাছি। সামনের মাসগুলোয় আরও কমবে বলেই আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।


বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, সর্বশেষ ফেব্রুয়ারি মাসেও প্রবাসী আয়ের অঙ্কটা ছিল ১৪৫ কোটি ডলার। চলতি অর্থবছরের মার্চে রেমিট্যান্স এসেছে ১২৮ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার। এটি গত ১১ মাসের মধ্যে সর্বনি¤œ। এর আগে গত অর্থবছরের সেপ্টেম্বরের পর যে কোনো মাসের তুলনায় সবচেয়ে কম। 


মাত্র এক মাসের ব্যবধানে প্রবাসী আয় কমেছে ১ হাজার ৪১১ কোটি টাকা। যা গত ১৫ মাসের মধ্যে সর্বনি¤œ। ২ শতাংশ প্রণোদনা ঘোষণার পর ১৪০ কোটি ডলারের কম রেমিট্যান্স আসেনি কোনো মাসেই।


গত অর্থবছরের সেপ্টেম্বরে প্রবাসীরা ১১৪ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠান। এছাড়া অর্থবছরের মার্চে রেমিট্যান্স আসে ১৪৬ কোটি ডলার। এক বছরের ব্যবধানে রেমিটেন্স কমেছে ১২ দশমিক ৩২ শতাংশ। 


সংশ্নিষ্টরা জানান, দেশ স্বাধীনের পর থেকে সাধারণত কখনো রেমিট্যান্সে ধারাবাহিকভাবে পতন দেখা যায়নি। তবে ২০১৫ সাল থেকে টানা তিন বছর রেমিট্যান্স কমে। বিশেষ করে বিদেশ থেকে হুন্ডির মাধ্যমে পাঠানো অর্থ মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করে সহজে সুবিধাভোগীর কাছে পৌঁছে দেয়ার সুযোগের ফলে অনেকেই এ পথ বেছে নিচ্ছিলেন। এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকার। তখন মোবাইল ব্যাংকিংয়ে লেনদেন কমানোসহ নিয়ন্ত্রণমূলক নানা উদ্যোগের ফলে বাড়তে শুরু করে। রেমিট্যান্সে আরো গতি এনে দেয় প্রণোদনার ঘোষণা।


চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই রেমিট্যান্স প্রবাহ ব্যাপকহারে বাড়তে থাকে। কোনো কোনো মাসে ৩২ শতাংশ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এর মূল কারণ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠালে অতিরিক্ত ২ শতাংশ হারে নগদ প্রণোদনা। অক্টোবর থেকে প্রণোদনা দেওয়া শুরু হয়েছে। বিশ্বব্যাপী প্রাণঘাতী করোনার সংক্রমণে প্রায় সব দেশই লকডাউনে। সব ধরনের কার্যক্রম এবং যোগাযোগ বন্ধ। বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের মূল উৎস মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এবং ইউরোপের কয়েকটি দেশ। ইউরোপের দেশগুলোয় করোনা ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে।


মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো লকডাউনের কারণে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। প্রবাসীরা ঘরে আটকা পড়েছেন। অনেকেই বেতন পেলেও তা দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে পারছেন না। রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ এবং বিনিময় হার বেড়েছে। ফলে আগের তুলনায় অনেক লোকসান হচ্ছে প্রবাসীদের। অন্যদিকে অনেক প্রবাসীই ঘরে আটকে থাকায় কাজ করতে পারছেন না বলে তাদের আয়ের রাস্তাও বন্ধ।

তেলনির্ভর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অর্থনীতি ইতোমধ্যে মন্দায় পড়েছে। তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ২০ ডলারে নেমে এসেছে। কোথাও কোথাও এর থেকে অনেক কম। তেলনির্ভর দেশগুলোয় সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি শ্রমিকরা কাজ করেন। আসন্ন মন্দায় প্রবাসী আয়ে ব্যাপক ধস নামার আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও অভিবাসন খাত সংশ্লিষ্টরা।


চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ের রেমিট্যান্স আসে ১৬০ কোটি মার্কিন ডলার। ডিসেম্বরে তা আরও বেড়ে হয় ১৬৯ কোটি ডলার। চীনে করোনার সংক্রমণ ধরা পড়ে ডিসেম্বরের শেষের দিকে। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে তা বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারি রেমিট্যান্স কমে হয় ১৬৪ কোটি ডলার। ফেব্রুয়ারিতে তা আরও কমে হয় ১৪৫ কোটি ডলার।


তবে সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) সর্বমোট রেমিট্যান্স এসেছে ১ হাজার ৩৭৮ কোটি ডলার। আগের বছরের একই সময়ে রেমিট্যান্স আসে ১ হাজার ১৮৭ কোটি ডলার। এই হিসেবে রেমিটেন্স প্রবাহ বেড়েছে ১৬ শতাংশের মতো।


সংশ্লিষ্টরা জানান, বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় অনেক দেশে লকডাউন চলছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স আহরণে শীর্ষে থাকা সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কুয়েত, মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য, ওমান, কাতার, ইটালি, বাহরাইনসহ অধিকাংশ দেশে অচলাবস্থা বিরাজ করছে। বেশিরভাগ দেশে চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকায় হাতে টাকা থাকলেও অনেকে পাঠাতে পারছেন না। আবার অনেকে ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলার জন্য সঞ্চয় করছেন।


বিদেশে যারা অ্যাপভিত্তিক ভাড়া গাড়ি বা ট্যাক্সি চালিয়ে জীবন নির্বাহ করেন, অস্থায়ীভাবে দৈনিক মজুরিভিত্তিতে হোটেল, রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন কাজ করেন, তারা নিজেরা অনিশ্চয়তায় জীবন পার করছেন। এর বাইরে করোনা আতঙ্কে অনেক প্রবাসী এরই মধ্যে দেশে ফিরেছেন। অনেকেই পরিস্থিতির উন্নতি হলে দেশে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন। করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার পরও অনেকে যে কর্মহীন হয়ে পড়বেন, সে আভাস মিলছে বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে। ফলে আগামীতে রেমিট্যান্স আরো কমার আশঙ্কা করা হচ্ছে।


রেমিট্যান্স সংগ্রহের কাজে যুক্ত ব্যাংকগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিশ্বের প্রায় সব দেশই জরুরি সেবা ছাড়া সব ধরনের সেবা বন্ধ। সেখানে ব্যাংক খোলা থাকলেও তা জরুরি কাজের জন্য। রেমিট্যান্স হাউজগুলো বন্ধ রয়েছে। প্রবাসী কাজে বের হতে পারছে না। বেতন পেলেও তারা অর্থ পাঠাতে পারছে না। কেউ কেউ অনিশ্চয়তার কথা ভেবে টাকা কাছে রেখে দিচ্ছেন। এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে করোনার কারণে। এ সংক্রমণ যত তীব্র হবে রেমিট্যান্সের ধাক্কা আরও বাড়বে।


বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানের তথ্য মতে, গত জানুয়ারিতে আমদানি কমেছে ১৩ শতাংশ, ফেব্রুয়ারিতে রফতানি কমেছে ২ শতাংশ। বেসরকারি খাতে ঋণ বৃদ্ধি ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে নেমে এসেছে। এটি এক যুগের মধ্যে সবচেয়ে কম। সরকারের রাজস্ব আয়ের গতিও অনেক কম। অর্থবছরের শুরু থেকেই এসব সূচক নেতিবাচক ধারায় কিছু কিছু প্রবৃদ্ধি হলেও তা রেকর্ড পরিমাণ কম হচ্ছে।


বিশ্লেষকদের মতে, রেমিট্যান্স কমে গেলে অর্থনীতিতে আরও চাপ তৈরি হবে। কেননা, গত কয়েক মাস ধরে রফতানি কমে গেছে। আমদানির পরিমাণও বেশ কিছুদিন ধরে কমছে। 


চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত ২ হাজার ৬২৪ কোটি মার্কিন ডলারের রফতানি হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় যা ৪ দশমিক ৭৯ শতাংশ কম। এর মধ্যে মার্চে প্রায় ৪০০ কোটি মার্কিন ডলারের রফতানি আদেশ বাতিল হওয়ার খবর মিলেছে। অন্যদিকে গত জানুয়ারি পর্যন্ত আমদানি কমেছে ৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ। ফেব্রুয়ারি ও মার্চে আমদানি আরও কমেছে বলে জানিয়েছেন ব্যাংকাররা।


মাইগ্রেশননিউজবিডি.কম/এসআর ##

 

share this news to friends