যেকোন মূল্যে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে

“অস্ট্রেলিয়ান একটি প্রতিষ্ঠান আমাদের হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে নিরাপত্তায় ফাইভ স্টারের মর্যাদা দিয়েছে। যেটা আমার জন্য খুব সম্মানের। এজন্য বহির্বিশ্বে আমাদের ভাবমর্যাদা উজ্জ্বল হবে।”- গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সচিবালয়ে নিজ দফতরে এভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এওএবি) এর প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক শেষে এভাবেই বেশ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী। 

এ সংবাদটি অবশ্যই সুখকর ছিল। কিন্তু সে সুসংবাদটি এখন মূল্যহীন হয়ে পড়েছে! গতকাল রোববারের (২৪ ফেব্রুয়ারি) বিমান ছিনতাই চেষ্টার ঘটনা বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে আবারও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এর আগে দফায় দফায় বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা শাহজালালের নিরাপত্তা ঘাটতির কথা জানিয়ে আসছিল। এমনকি প্রবাসী বাংলাদেশিরাও বিভিন্ন সময় বিমানবন্দরে বহুমুখি হয়রানির মুখোমুখি হওয়ার অভিযোগ করে আসছিলেন। 

চলতি মেয়াদে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. ইমরান আহমদ বিশেষ করে শাহজালাল বিমানবন্দরের বদনাম ঘুচানোর জন্য অবিরাম পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। কার্গ হ্যান্ডেলিংয়ে যে সমস্যাগুলো আছে সেগুলো দেখতে বিমান প্রতিমন্ত্রী এক মাসের মধ্যে ৫ বার বিমানবন্দর গিয়েছেন। প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রীও কোন এক সকালে ঝটিকা পরিদর্শনে যান। তাঁদের তৎপরতায় অবশ্য ফেরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের হয়রানি কিছুটা কমেছে এবং  ইমিগ্রেশন শেষ করে আসার সঙ্গে সঙ্গে লাগেজ পাওয়া যাচ্ছে।

কিন্তু রোববারের ঘটনা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তার দুর্বলতা নিয়ে পূর্বেকার সমালোচনা নতুন করে সামনে এনেছে। দুর্বল নিরাপত্তার কারণে শাহজালালকে মাদক ও স্বর্ণ চোরাকারবারিরা রুট হিসেবে বেছে নিচ্ছেন বলে সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন সময়। একপর্যায়ে ঢাকা থেকে লন্ডন সরাসরি কার্গো চলাচলও বন্ধ করে দেয় যুক্তরাজ্য। যদিও ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে মালবাহী (কার্গো) উড়োজাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় যুক্তরাজ্য।

এখন একটাই প্রশ্ন - আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ওই যাত্রী উড়োজাহাজের ভেতরে ঢুকলেন কী করে? পত্রিকান্তরে জানা যায়, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সূত্রগুলো বলছে, উড়োজাহাজটির পথ ছিল ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে দুবাই। উড়োজাহাজটি আন্তর্জাতিক রুটের হলেও সেটিতে অভ্যন্তরীণ যাত্রীদেরও নেওয়া হয়। বিমান ছিনতাইয়ে অভিযুক্ত ওই ব্যক্তি (নিহত) অভ্যন্তরীণ টার্মিনাল দিয়ে ঢুকে উড়োজাহাজে উঠেছিলেন। অভ্যন্তরীণ টার্মিনালে যাত্রীদের ব্যাগ স্ক্যানারে পরীক্ষা করা হলেও যাত্রীদের তেমন একটা দেহ তল্লাশি করা হয় না। এই ঢিলেমির সুযোগটি ওই যাত্রী নিয়ে থাকতে পারেন। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পথের যাত্রীর শাহজালাল বিমানবন্দরের মূল টার্মিনাল দিয়ে অন্তত দু’দফা সর্বাত্মক নিরাপত্তা তল্লাশি পার হতে হয়।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এম নাইম হাসান সাংবাদিকদের বলেছেন, তাঁরা তদন্ত করবেন। সবগুলো সিসিটিভি চেক করবেন। স্ক্যানার মেশিনের সিসিটিভিও চেক করবেন। কারণ এই মেশিনের ভেতর দিয়ে যদি নেইল কাটার, খেলনা পিস্তল, ছুরিসহ সকল ধরনের ধাতব পদার্থ, আগ্নেয়াস্ত্র ও দাহ্য পদার্থ ধরা পড়তে পারে।

রোববারের ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। তারা তদন্ত করে প্রতিবেদন দিবেন। সে প্রতিবেদনে হয়তো দায়ী ব্যক্তি চিহ্নিতপূর্বক কিছু সুপারিশও থাকবে। সেসব সুপারিশের বাস্তবায়ন নিয়েও আগাম প্রশ্ন উঠছে। কারন, কেউ কেউ বলছেন সর্ষের মধ্যেই নাকি ভূত আছে! অভিযোগ রয়েছে, বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় বিমানবাহিনী, পুলিশ, গোয়েন্দা ও আনসার সদস্যেদের নিয়ে এভিয়েশন সিকিউরিটি ফোর্স (এভসেক) এর একাধিক সদস্য স্বর্ণ চোরাচালানচক্রে যুক্ত। গত বছর শাহজালালের স্পর্শকাতর এলাকায় ঢুকে পড়েন কাস্টমসের রাজস্ব সহায়ক কর্মকর্তা তোহরা বেগম। 

এর চারদিন আগে ওই বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি আত্মীয়কে এগিয়ে দিতে পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) আশিকুর রহমান থাই এয়ারের একটি উড়োজাহাজের ভেতরে ঢুকে পড়েছিলেন। বিমানটি রানওয়েতে গড়ানোর আগ মুহূর্তে বিষয়টি ধরা পড়ে। নিরাপত্তা লঙ্ঘনের অজুহাত তুলে বিমানটির ক্যাপ্টেন সেটি চালাতে অস্বীকৃতি জানিয়ে নেমে পড়েন। ২০১৬ সালের নভেম্বরে শাহজালালের বহির্গমন টার্মিনালে ঢোকার মুখে এক যুবকের ছুরিকাঘাতে নিহত হন এক আনসার সদস্য। পুলিশ যুবকটিকে মানসিক ভারসাম্যহীন বলেই দায়িত্ব শেষ করেছিল বলে গণমাধ্যমে খবর বেরোয়। 

এসব ঘটনার পুনারাবৃত্তি হওয়াটা সত্যিই দুঃখজনক, যা প্রকারান্তরে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ঘাটতিরও ইঙ্গিত দেয়। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, অপারেটরদের সহায়তা ছাড়া রোববার ওই যুবক পিস্তল নিয়ে বিমানে উঠতে পারতো না। নিরাপত্তারক্ষীরা কি তবে সন্দেহভাজন যুবকটির সাথে  আপস করেছিল? কেন আপস করেছিল? কিসের বিনিময়ে ছিল এ আপস?

এরকম ঘটনা বহির্বিশ্বের নেতিবাচক বার্তা দিতে পারে। বিশ্বের অনেক দেশ বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট অবতরণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। বিমান পথ কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের  ক্ষেত্রে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ ধরনের ঘটনা বাংলাদেশ বিমানের জন্য শুভকর হবে না। তাই অবিলম্বে তদন্ত সম্পাদন করা উচিত। এবং কর্তৃপক্ষের উচিত হবে কোন রকম কালক্ষেপন না করে প্রতিবেদনগুলোর সুপারিশ বাস্তবায়ন করা। 

আমরা বলবো, একই সাথে দেশের অন্যান্য বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তাও যেকোন মূল্যে নিশ্চিত করুন। জাতীয় স্বার্থেই এ নিশ্চয়তা জরুরি। দেশের অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রা যেন বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ঘাটতির অজুহাতে হোঁচট না খায়, সেটা  অবশ্যই সর্বাগ্রে বিবেচনায় আনতে হবে।  ##

share this news to friends