প্রসঙ্গ : শাহজালালে পিস্তল নিয়ে প্রবেশ

গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, প্রচলিত নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে ঘোষণা ছাড়াই অস্ত্র নিয়ে ঢাকার হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রবেশ করায় সাতক্ষীরা জেলা আওয়ামী লীগের কৃষিবিষয়ক সম্পাদক এস এম মজিবুর রহমানকে আটক করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার (২২ মার্চ) বিকেলে বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ টার্মিনালে এ ঘটনা ঘটে। দেশের বেসরকারি বিমান পরিচালনা প্রতিষ্ঠান নভোএয়ারের একটি ফ্লাইটে করে তার যশোর যাওয়ার কথা ছিল। তার কাছ থেকে ব্রাজিলের তৈরি একটি পিস্তল ও ৩৫টি গুলি জব্দ করা হয়েছে।
 
সিভিল এভিয়েশন নিরাপত্তা বাহিনী অ্যাভসেকের পরিচালক উইং কমান্ডার নূরে আলম সিদ্দিকী জানান, এর বৈধ লাইসেন্স থাকলেও ঘোষণা না করার অপরাধে সেগুলো জব্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি এস এম মজিবুর রহমানকে বিমানবন্দর থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। বিমানবন্দরে স্ক্যান মেশিনে তল্লাশির সময় হাত ব্যাগে ঘোষণা ছাড়াই অস্ত্র বহনের বিষয়টি জানতে চাইলে মজিবুর নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন বলেও গণমাধ্যমে এসেছে।

শাহজালালে পিস্তল নিয়ে প্রবেশের ধারাবাহিক ঘটনার সর্বশেষ কান্ড এটি। বিমানবন্দর একটি স্পর্শকাতর ও অতি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। কিন্তু শাহজালাল বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা নাজুক তা প্রমাণিত হয় গত ২৪ ফেব্রুয়ারি যুবক পলাশের বাংলাদেশ বিমানের ‘ময়ূরপঙ্খী’ উড়োজাহাজ ছিনতাই চেষ্টার ঘটনার মধ্য দিয়ে। নড়েচড়ে বসে কর্তৃপক্ষ। সেদিন উড়োজাহাজটি শাহজালাল থেকে ছেড়েছিল, চট্টগ্রাম হয়ে দুবাই যাওয়ার উদ্দেশ্যে। কিন্তু ওই উড়োজাহাজের অভ্যন্তরীণ রুটের যাত্রী পলাশ কোন বাধা ছাড়াই পিস্তল নিয়ে ঢুকে পড়েন অন্দরমহল পর্যন্ত। তারপর তো যতসব হুলস্থুল ব্যাপার ঘটে গেলো।

কর্তৃপক্ষের তৎপরতার মধ্যে গত ১৬ মার্চ বিকেল সাড়ে পাঁচটায় শাহজালালে নিয়ম না মেনে ঘোষণা ছাড়া অস্ত্র নিয়ে প্রবেশ করেন প্রবাসী পল্লী গ্রুপের চেয়ারম্যানের দেহরক্ষী নুরুল ইসলাম। তিনি নভোএয়ারের ভিকিউ-৯৪৫ ফ্লাইটে যশোর যাচ্ছিলেন। তাকেও আটক করে এভিয়েশন নিরাপত্তা সংস্থা এভসেক। এর আগে ১১ মার্চ একই অভিযোগে যশোরের চৌগাছা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ফুলসর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মেহেদী মাসুদ চৌধুরীকে আটক করা হয়েছিল। গত ৮ মার্চ শাহজালালের অভ্যন্তরীণ টার্মিনালে প্রথম চেকিং পার হওয়ার পর নিজের সঙ্গে অস্ত্র থাকার কথা স্বীকার করেন মামুন আলী নামে এক যাত্রী। পরে নিয়ম মেনে অস্ত্রটি সিলেট নিয়ে যাওয়ার সুযোগ পান তিনি।

এর মধ্যে আরেকটি ঘটনা ঘটে ৫ মার্চ। ওইদিন নিজের লাইসেন্স করা পিস্তল নিয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের স্ক্যানিং মেশিন পার হন চিত্রনায়ক ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সংগঠক  ইলিয়াস কাঞ্চন। তিনি সেটা মনের ভুলে নিয়ে এসেছেন জানালে, সেলিব্রেটি হিসেবে নিরাপত্তাকর্মীরা তাকে পিস্তল বহন করতে বাধা দেননি। এ নিয়েও অনেক ‘বাগযুদ্ধ’ হয়েছে।

আমরা দেখতে পাই, পিস্তল নিয়ে শাহজালাল বিমানবন্দরে প্রবেশের এসব ঘটনার কোনটি অজ্ঞাতসারে, কোনটি ক্ষমতার প্রভাব প্রদর্শনের হীন মানসিকতার নমুনা হিসেবে আর কোনটিবা অপরাধ সংঘটনের উদ্দেশ্যে। অন্তনির্হিত উদ্দেশ্য যাই হোক, ঘোষনা না দিয়ে যে কোন প্রকার অস্ত্র বহনই সার্বিক নিরাপত্তার জন্য ‘হুমকি’ হিসেবে বিবেচ্য। কাগুজে বৈধতা থাকলেই যে তা কেবল বৈধ কাজে বা বৈধভাবে ব্যবহার করা হবে, এর নিশ্চয়তা কে দেবে? তবুও ‘লাইসেন্স’প্রাপ্ত অস্ত্র বিমানবন্দরে প্রবেশ ও উড়োজাহাজে পরিবহন আইনত স্বীকৃত। সেক্ষেত্রে অবশ্যই অস্ত্রবহনকারীকে কিছু বিধানের মধ্যে চলতে হয়।

অস্ত্রের লাইসেন্স পাওয়া যতটা সহজ, সেই অস্ত্রের বৈধ ব্যবহার নিশ্চিত করা ততটা কঠিন বৈকি। অনেকেই জানেন না, যেকোনো বিমানে অস্ত্র পরিবহনের কিছু নিয়মনীতি রয়েছে। বিমান চলার সময় কোন যাত্রীই সঙ্গে অস্ত্র রাখতে পারবেন না। নিয়ম অনুযায়ী, প্রথমেই যাত্রীকে বিমানবন্দরের প্রবেশ মুখেই ঘোষণা দিতে হবে যে, তার কাছে অস্ত্র রয়েছে। তিনি যে বিমানের যাত্রী, সেই বিমান সংস্থার কাছে অস্ত্র, লাইসেন্স, গুলি সবকিছু জমা দিতে হবে। বিমান সংস্থা থেকে তাকে একটি রসিদ সংগ্রহ করতে হবে। এই অস্ত্র এবং গুলি বিশেষ বাক্সে করে বিমানের পাইলটের তত্ত্বাবধানে গন্তব্যে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার সময় তিনি বোর্ডিং পয়েন্ট থেকে নিজের অস্ত্রটি আবার বুঝে নেবেন। কিন্তু বিমান চলার সময় তিনি সঙ্গে অস্ত্র রাখতে পারবেন না। এতো গেলো অভ্যন্তরীণ রুটের বিমান যাত্রীর বেলাকার কথা। 

আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের ক্ষেত্রে যাত্রীর আরো কিছু কাগজপত্র জমা দিতে হবে। যেমন যে দেশে তিনি যাচ্ছেন, সেখানে এই অস্ত্র বহনের অনুমতি তার রয়েছে, এরকম প্রমাণ লাগবে। পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র দরকার হবে যে, তিনি বিদেশে অস্ত্রটি নিয়ে যেতে পারবেন। 

যেকোনো ব্যক্তি বিমানবন্দরে প্রবেশে করার সময় বেশ কয়েকটি নিরাপত্তা ধাপ পার হয়ে যেতে হয়। যেখানে ব্যক্তির শরীরে তল্লাশির পাশাপাশি তার সঙ্গে থাকা মালামালও স্ক্যানিং করা হয়। কোন অস্ত্র থাকলে এসব নিরাপত্তা ধাপে অবশ্যই ধরা পড়বে। যদি কোন যাত্রী এরকম ঘোষণা না দিয়ে বৈধ অস্ত্র নিয়ে বিমানবন্দরে প্রবেশের চেষ্টা করেন, তাহলে সেটি একটি অপরাধ হিসাবে গণ্য করা হবে। তখন প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তাকে থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। 

সাম্প্রতিক সময়ে শাহজালাল বিমানবন্দরের দীর্ঘদিনের প্রশ্নবোধক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে উদ্বেগের জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে যাত্রী সাধারনের অস্ত্র নিয়ে প্রবেশের উপর্যুপরি ঘটনা। একই সাথে েেদশের অন্য বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে এক শ্রেণির যাত্রীর আইন অমান্যের ধৃষ্টতা আর কত? লাইসেন্স প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ কি দায় এড়াতে পারে? কেননা শর্তসাপেক্ষে বাংলাদেশের উপযুক্ত নাগরিকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার দিক বিবেচনায় অস্ত্রের লাইসেন্স দিয়ে থাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সে লাইসেন্সধারীকে সচেতন বা প্রশিক্ষিত করে তোলার দায়িত্বও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপর বর্তায়। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব অস্ত্র বহনের ঘোষণা দিল না কিনা তা দেখা। কোন হোমরা-চোমরা যদি হামবড়া ভাব দেখিয়ে অস্ত্রের ঘোষণা না দেন, উপরন্তু বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কর্মীদের সাথে অশোভন আচরন করেন, তাহলে বন্দর কর্তৃপক্ষের এখানে করণীয় খুবই সীমিত পর্যায়ের। তাই এ ধরনের ঘটনার জন্য শুধু বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বা বিমান মন্ত্রণালয়কে দোষারোপ করা সঙ্গত হবে না বলে মনে করি।

ইতোমধ্যে লক্ষ্য করেছি, অস্ত্র বহনের সিরিজ ঘটনায় বিমান মন্ত্রণালয় থেকে ক্ষোভ ও আক্ষেপের সাথে বলা হয়েছে, কেউ কেউ গণমাধ্যমের শিরোনাম হওয়ার জন্য এমনটি করছেন। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারনেও কেউ কেউ নিজেকে আইনের উর্ধ্বে মনে করেন। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে এ বিষয়টিই প্রতিভাত হয়েছে বেশি। আর নিরাপত্তা কর্মীদের দায়িত্বপালনে অবহেলা বা আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে অস্ত্রধারীদের সহায়তা করার প্রবণতাও প্রতীয়মান হয়েছে। মন-ভুলো হয়ে অস্ত্র বহনও নিরাপত্তার বিচারে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। শাহজালাল বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে অনেক দেশেরই অভিযোগ-আপত্তি রয়েছে। জননিরাপত্তা তথা অভিযোগ-প্রশ্ন উৎরাতে যেকোন মূল্যে বিমানবন্দরের নিñিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিমান মন্ত্রণালয় ও যাত্রী সাধারনের সম্মিলিত প্রয়াস ও সহযোগিতা দরকার। ##

share this news to friends