‘অভিবাসী বা মুসলিম বিরোধী বিবৃতির সঙ্গে জাতিগত হামলার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে’
ছবি : মিজ সুমান রাঘুনাথান। - সংগৃহিত

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে গত ১৫ মার্চ জুমার নামায আদায়কালে মুসল্লিদের উপর অস্ট্রেলীয় শ্বেতাঙ্গ উগ্রপন্থী সন্ত্রাসীর গুলি বর্ষণের ঘটনা স্তম্ভিত করেছে পুরো বিশ্বকে। ক্রুদ্ধ করেছে জাতি বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষকে। জাগিয়ে তুলেছে বিবেককে। সবাই ভাবছেন কীভাবে সম্ভব একজন মানুষের পক্ষে নির্বিচারে মসজিদে ঢুকে এভাবে গুলি চালানো, এতগুলো মানুষকে মেরে ফেলা এবং পুরো ঘটনা সামাজিক মাধ্যমগুলোতে সরাসরি তা প্রচার করা। কেন এত বিদ্বেষ, কেন এত হিংসা, কেন এত প্রতিশোধপরায়নতা?

বিভিন্ন ধরনের সংগঠনের জন্ম দিয়েছে এই ধরনের জাতি বিদ্বেষ, বর্ণ বিদ্বেষ ঘটনাগুলো। মানবাধিকার সংগঠনগুলো ক্রমাগত কাজ করে যাচ্ছে পৃথিবীর অসহায় মানুষগুলোর জন্য। তেমনি একটি সংগঠন ‘সাউথ এশিয়ান আমেরিকান লিডিং টুগেদার (সল্ট)’। এই সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক মিজ সুমান রাঘুনাথানের সঙ্গে কথা বলেছি ক্রাইস্টচার্চে গুলি বর্ষণের ঘটনা নিয়ে। 

সুমান বলছিলেন, “এই ঘটনা কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে মানুষের ওপর, সম্প্রদায়ের ওপর এবং পুরো জাতির ওপর তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভাব নয়। আমি এই ঘটনায় অত্যন্ত মর্মাহত এবং আমার মতো আর সবাই মর্মাহত। এই পরিকল্পিত ঘটনা ঐ ব্যক্তি ঘটিয়েছেন মানুষের মনে ভীতি সঞ্চারের জন্য। ঘৃণার বীজ বপন করেছেন মানুষের মনে। সামাজিক মাধ্যমে তার বর্বরতা সরসরি প্রচার করে তিনি শ্বেতাঙ্গদের আধিপত্য, তাদের ক্ষমতা সবাইকে যেন বোঝাতে চেয়েছেন। এবং এই ধরনের মনভাবাপন্ন মানুষের বসবাস শুধু কোন নির্দিষ্ট স্থান বা দেশে নয় পুরো বিশ্বজুড়ে।”

সুমানের কাছে জানতে চেয়েছিলাম তার কী মনে হয়, কেন এই ব্রেন্টন ট্যারেন্ট নিউজিল্যান্ডের মতো একটি দেশে, মসজিদে ঢুকে নির্বিচারে গুলি চালাল?

তিনি বললেন, “আমার মতে, এই হামলাকারী এবং তার মতো শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ব মতবাদ বিশ্বাসীরা এইরকম একটি দেশের মসজিদে যখন হামলা করে তখন তারা অনেক সূক্ষè পরিকল্পনা করে বুঝে শুনেই করে। তারা মসজিদ বেছে নিয়েছে আমার মনে হয় এর কারণ, মুসলিম সম্প্রদায় মসজিদে নিজেদের সবচাইতে নিরাপদ মনে করে। যেখানে তারা একটু শান্তির জন্য সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করতে যান, আশ্রয়ের জন্য যান, যেখানে তারা নিরবে তাদের মনের কথা বলেন, সৃষ্টিকর্তাকে কৃতজ্ঞতা জানান, সেই জায়গাটি যে আর নিরাপদ নয় তাদের জন্য, সেই বার্তা পৌঁছানোর জন্যই যেন এই হামলা।”

সুমানের কাছে প্রশ্ন রেখেছিলাম, হঠাৎ করে যেন এই জাতিগত বিদ্বেষ, হিংসা, হানাহানি বেড়ে গেছে। কেন এমন হল? কেন এই হামলাকারী সামাজিক মাধ্যমে সরাসরি প্রচার করলো তার এই তান্ডব? 

এর উত্তরে তিনি বলেন, “বেশ কিছু সময় ধরে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ব, শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদ, শ্বেতাঙ্গ চরমপন্থী মতবাদের অধিকারীরা বিশ্বব্যাপী খুব জোরালো হয়ে উঠেছে। এবং এর মূল কারণ হচ্ছে অভিবাসীদের বিরুদ্ধে, বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ইউরোপ সহ উন্নত দেশগুলোতে যেই কঠোর নীতিমালা গ্রহন করা হয়েছে তার ফলশ্রুতিতেই এই ধরনের হামলাগুলো ঘটছে। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসীদের প্রতি যেই মনোভাব, এই সম্প্রদায়ের মানুষদের বৈধতা না দেওয়া আরও একটি কারণ ক্রাইস্টচার্চের হামলার। বর্তমান প্রেসিডেন্ট যখন বলেন, শারলটভিলে যেই হামলাকারীরা একজন নিরীহ নারীকে মেরে ফেলেছে, তারা অত্যন্ত ভালো মানুষ তখন কিন্তু খুব শক্ত একটি বার্তা বিশ্বের মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে এবং এর কারণে শ্বেতাঙ্গ মতবাদ বিশ্বাসীরা আরও যেন গর্জে উঠছে। ক্রাইস্টচার্চের ঘটনার পরেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্বীকার করতে নারাজ যে যুক্তরাষ্ট্রে শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদ ভয়ংকর আকারে মাথা চেড়ে উঠেছে।”

সুমানকে জিজ্ঞেস করেছিলাম তার সংগঠন অনেকদিন ধরে মানবাধিকার, জাতিগত ন্যায়বিচার নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। তারা এই পর্যন্ত কতটুকু সফলতা পেয়েছে, এবং ক্রাইস্টচার্চের ঘটনার পর তাদের কাজ এখন কী হবে?

তিনি বলেন, “আমাদের অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যেন আমাদের সম্প্রদায় নিরাপদে এই দেশে বসবাস করতে পারে। একটি সুস্থ সুন্দর জীবনযাপনের জন্য যা যা প্রয়োজনীয় তা যেন নির্বিঘেœ নিরাপদে করতে পারে সেই পরিস্থিতি আমাদের তৈরি করতে হবে। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মুসলিম সম্প্রদায়ের মনের ওপর যেই ভীতির সঞ্চার হয়েছে, যেই মর্মবেদনার মধ্য দিয়ে তারা যাচ্ছেন, সেই পরিস্থিতি থেকে তাদের বেরিয়ে আসার জন্য একে অপরকে সাহায্য করবো আমরা। আইনপ্রণেতারা আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষে কী কাজ করছেন তা আমাদের অবশ্যই দেখা প্রয়োজন। আমার মনে হয়না এই পর্যন্ত আমরা তেমন জোরালো কোনও বার্তা আইনপ্রণেতাদের প্রতি পৌঁছাতে পেরেছি নিরাপত্তার বিষয়ে, যার পরিপ্রেক্ষিতে এই জাতিগত হামলাগুলো অহরহ ঘটে যাচ্ছে। আমাদের সংগঠন ‘সল্ট’ কয়েক দশক ধরে এই বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। গত ২/৩ বছরে আমরা যা দেখতে পেয়েছি তা হচ্ছে অভিবাসী বিরোধী বিবৃতি বা মুসলিম বিরোধী বিবৃতির সঙ্গে এই জাতিগত হামলার সরাসরি একটি সম্পর্ক রয়েছে। যখনই কোন নেতা বা উন্নয়নশীল দেশ কোন নির্দিষ্ট জাতি, সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে কোন নীতিমালা গ্রহন করে বা বিবৃতি দেয়, শ্বেতাঙ্গ মতবাদ বিশ্বাসীরা যেন আরও জোর পেয়ে যায়। আমরা আরও দেখেছি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর এই ধরনের হামলা যতবার হয়েছে ততবার হামলাকারীরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উদ্ধৃতি দিয়েছে, তার নির্বাচনী প্রচারণার কথা বলেছে। খুব দুঃখজনক হলেও সত্যি, এই হামলাকারীদের উসকে দিচ্ছে রাজনৈতিক নেতারা। তারা দেশ বা দেশের মানুষকে এক করার জন্য কোনও নীতি গ্রহন করছেনা।”

সবশেষে মিজ সুমান রাঘুনাথান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ যাতে সম্মানের সঙ্গে নিরাপদে বসবাস করতে পারে সেজন্য তাদের সংগঠন অন্যান্য সংগঠনের সঙ্গে একযোগে কাজ করে যাবে। সূত্র : ভয়েস অব আমেরিকা (ভোয়া)।

মাইগ্রেশননিউজবিডি.কম/সাদেক ##

share this news to friends