শাহজালাল (রহ.) বিমানবন্দরে অভিযোগের পাহাড় ও গণশুনানি

মাইগ্রেশন নিউজ সহ বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে, যাত্রীদের অভিযোগ শুনতে ও যাত্রীসেবার মান উন্নয়নে ঢাকার হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ নিজেরাই একটি গণশুনানির আয়োজন করেন। গত রোববার (২৮ এপ্রিল) দুপুরে বিমানবন্দরের টার্মিনাল-১ বহির্গমন কনকোর্স হলে এ গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত গণশুনানিতে যাত্রীদের অভিযোগ শোনেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এম নাইম হাসান। অভিযোগগুলো স্বল্প সময়ে সমাধানের আশ্বাসও দেন তিনি।

উদ্যোগটি প্রশংসনীয়। যাত্রীদের পক্ষ থেকে প্রাপ্ত অভিযোগসমূহ যত দ্রুত সম্ভব সমাধানের আশ্বাস আরো বেশি আশা সঞ্চার করে। একই সাথে বেবিচক চেয়ারম্যানের সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতার হিসেব মেলালে তাতে হতাশার পাল্লাই ভারি হবে। বেবিচক চেয়ারম্যান ওষুধটা লাগাবেন কোথায়? শাহজালালে যাত্রীদের বিড়ম্বনা-হয়রানি তো নতুন কিছু নয়। বছরের পর বছর ধরে চলে আসা অনিয়মগুলোই যেন বিমানবন্দরে নিয়মে পরিণত হয়েছে।

উক্ত গণশুনানিতে আব্দুল্লাহ শাওন নামে এক যাত্রী বলেন, বিমানবন্দরের অবকাঠামোগত অনেক উন্নতি হয়েছে। আগের চেয়ে অনেক কিছুই সুন্দরভাবে পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু দু:খের বিষয় অনেকের ব্যবহারে আমরা কষ্ট পাই। ইমিগ্রেশনে যারা আছেন, তাদের আমরা স্যার বলেই সম্বোধন করি, অথচ তারা ‘তুই’ বলে খারাপ আচরণ করেন।

যাত্রীর এমন অভিযোগের জবাবে বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আশরাফউজ্জামান বলেন, অনেকে এখানে কাজ করেন, কারো কারো ব্যবহারে সমস্যা থাকতে পারে। তবে এ বিষয়টি যেন আর না ঘটে সেই বিষয়ে পদক্ষেপ নিবো।

অপর যাত্রী খলিল সরদার বলেন, আমি বাহারাইন থেকে গালফ এয়ারে বাংলাদেশে এসেছি ৩ এপ্রিল। আজ পর্যন্ত আমার লাগেজ দিতে পারেনি। আমার বাড়ি বরিশাল। তিন দিন বরিশাল থেকে এসে বিমানবন্দরে ঘুরছি। কিন্তু কেউ সমাধান দিতে পারেনি।

বেবিচক চেয়ারম্যান বলেন, বিমানবন্দরের সব আয়োজনই যাত্রীদের জন্য। তাই যাত্রীদের সুযোগ সুবিধার দিকটি খেয়াল রাখতে হবে। বিমানবন্দরে যে সকল সংস্থা কাজ করে তাদের আচরণে যেন যাত্রীরা কষ্ট না পায় সেটিও খেয়াল রাখতে হবে।

বেবিচক চেয়ারম্যোন ও ইমিগ্রেশন পুলিশের এক কর্মকর্তা যেভাবে আশ্বাসের বাণী আর ইতিবাচক কথার ডালি শোনালেন তার পূর্ণ বাস্তবায়ন দেখতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে তা জানা নেই। এ ধরনের অসঙ্গতিগুলো আর কতকাল চলবে বা চলতে দেওয়া হবে? রাশ টেনে ধরতে প্রতিবন্ধকতা আছে কি? থাকে সেটা কী? এসব প্রশ্নের উত্তর যথার্থভাবে দেওয়ার সৎ সাহস যেদিন কর্তৃপক্ষ অর্জন করবেন সেদিনই সার্বিকভাবে নির্বিঘœ ও নিরাপদ বিমানবন্দর নিশ্চিত হবে বলে আমরা মনে করি। 

সেদিনে গণশুনানিতে উত্থাপিত অভিযোগের কোনটিই নতুন নয়। বরং এসব অভিযোগ আর অনিয়ম শাহজালাল বিমানবন্দরের প্রতিশব্দরূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। যাত্রীদের সাথে বিশেষ করে বিদেশ ফেরত রেমিট্যান্সযোদ্ধাদের ইমিগ্রেশনে ‘তুই-তুকারি’ করে খারাপ আচরণ করা অভিযোগ অনেক পুরনো। একইরকম পুরনো যাত্রীসাধারনের ল্যাফট বিহাইন্ড ব্যাগ ও হারিয়ে যাওয়া ব্যাগেজ উদ্ধারে হয়রানির অভিযোগও। লাগেজ সংগ্রহের ক্ষেত্রে টোকেন চালু হলেও বিড়ম্বনা থেকেই গেছে। প্রবাসী যাত্রীদের লাগেজ থেকে জিনিসপত্র খোয়া যাওয়ার ঘটনা চলছেই। বিমানবন্দরে প্রবেশপথের মোড় থেকেই শুরু হয় হয়রানি। এরপর কনকোর্স হল, মূল ভবন, ইমিগ্রেশন পুলিশ, কাস্টমস পোস্টসহ ঘাটে ঘাটে চলে হয়রানির মহোৎসব। অসংখ্য অভিযোগ, মন্ত্রীপর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সিভিল এভিয়েশনের কড়া তদারকি, প্রশাসনিক নজরদারিসহ গোয়েন্দা বিভাগগুলোর নানামুখী তৎপরতার পরও বন্ধ হচ্ছে না হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রী হয়রানি।  

এছাড়া কর্মকর্তাদের দক্ষতার অভাবেও হয়রানি হতে হয় যাত্রীদের। শাহজালালের সব বিভাগে আধুনিক প্রযুক্তি স্থাপন করা হয়েছে। কাস্টমস ও ইমিগ্রেশনের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হলেও যথেষ্ট দক্ষ নন। তারা ধীরগতিতে কোনোরকম কাজকর্ম চালিয়ে নেন মাত্র। এতে যাত্রীদের প্রতীক্ষার প্রহর দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়। মেশিন রিডেবল পাসপোর্টসহ অন্যান্য কাগজপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষায় যথেষ্ট সময় নেন তারা। পাশের দেশগুলোর বিমানবন্দরে একেকজন যাত্রীর সব কাগজপত্র পরীক্ষা করতে সময় লাগে পাঁচ-সাত মিনিট। আর শাহজালাল বিমানবন্দরে একেকজন যাত্রীকে ইমিগ্রেশন কাউন্টারে ২০-২৫ মিনিট ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। অদক্ষ কর্মী দিয়ে কম্পিউটারাইজড ব্যবস্থাপনা চালাতে গিয়ে ইমিগ্রেশন ছাড়পত্র শেষ করতে বেশির ভাগ সময়ই ফ্লাইট বিলম্বিত হয়। 

শুধু শাহজালালই নয়, দেশের অন্য বিমানবন্দরগুলোতেও অনিয়ম-অরাজকতার রাজত্ব চলছে। সরকার দেশের চলমান উন্নয়নযাত্রার সমান্তরালে বিমানবন্দরগুলোর সেবার মান বৃদ্ধি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুচ্ছ পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। কিন্তু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কারনে তাতে থোরাই সুফল মিলছে। এমনকি মন্ত্রী, নীতিনির্ধারকরা অভিবাসী বাংলাদেশিদের ‘সোনার ছেলে’ বলে অভিহিত করলেও বিমানবন্দরে নিযুক্ত কর্মচারীরা প্রবাসীদের সাথে অপমানজনক আচরন করে থাকে। নগদ লাভের মোহে অসাধুচক্রটি সরকার ও দেশের ভাবমর্যাদা ক্ষুন্ন করছে প্রতিনিয়ত। মনে রাখতে হবে, বিমানবন্দর একটি দেশের রুচি-সভ্যতার অনেক বড় পরিচয় বহন করে। এখানে সেবা-শৃংখলা ভালো মানে পুরো দেশ সম্পর্কে আন্তর্জাতিক যাত্রীদের ধারণা ভালো হওয়া, আর এখানের সেবা খারাপ মানে বিশ্বের মানুষের কাছে আমাদের দেশের দুর্নীতি-অনিয়ম কাপড় খুলে দেখিয়ে দেওয়া। এমনিতেই আমাদের বিমানবন্দরগুলো সম্পর্কে জনধারণা খুব ভালো নয়। তাই আমরা মনে করি, দেশের মুখ উজ্জ্বল করতেই গণশুনানির অভিযোগগুলোর দ্রুত সমাধান করতে হবে। গণশুনানি যেন কোনভাবেই ‘প্রহসনে’ পরিণত না হয়। ##

share this news to friends