ইউরোপের স্বপ্নে সাগরে মৃত্যু
ছবি : মৃত্যুঝূঁকি নিয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা।- সংগৃহিত


আবারো ভীষণ মনখারাপ করা সেই খবর। আবারো লিবিয়া থেকে নৌকায় চড়ে ইউরোপযাত্রা। আবারো মৃত্যু। আবারো ভূমধ্যসাগরে তিউনিসিয়া উপকূলে অভিবাসন প্রত্যাশীদের নৌকা ডুবেছে। এবার প্রাণ হারালেন অন্তত ৬৫ জন, যার অধিকাংশই বাংলাদেশি।

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যম বলছে, শুক্রবার (১০ মে) ভূমধ্যসাগরে ওই নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে। নৌকাডুবির পর তিউনিসিয়ার নৌবাহিনী ১৬ জনকে উদ্ধার করে। এখনো উদ্ধার অভিযান চলছে।

আহতরা বলছেন, বৃহস্পতিবার (৯ মে) লিবিয়ার জোয়ারা উপকূল থেকে অন্তত ৭৫ জন রওনা দিয়েছিলেন ইতালির উদ্দেশে। গভীর সাগরে পৌঁছানোর বড় নৌকা থেকে তাদেরকে ছোট একটি নৌকায় তোলা হয়। ছোট্ট সেই নৌকাটি কিছুক্ষণের মধ্যেই ঢেউয়ের তোড়ে ডুবে যায়। তিউনিসিয়ার নৌবাহিনী ও মৎস্যজীবীরা ১৬ জনকে উদ্ধার করতে সমর্থ হন। তাদের মধ্যে ১৪ জনই বাংলাদেশের নাগরিক।

উদ্ধার হওয়া যাত্রীরা বলছেন, নৌকাটিতে অন্তত ৫১ জন বাংলাদেশি ছিলেন। আর ছিলেন তিনজন মিশরীয় এবং মরক্কো, সাদ ও আফ্রিকার কয়েকজন নাগরিক। এই হিসাব থেকে অনুমান করা হচ্ছে, অন্তত ৩৭ জন বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে।

২০১৭ সালের মাঝামাঝি থেকে অভিবাসীদের ভূমধ্যসাগর হয়ে ইউরোপে পাড়ি দেওয়ার হার কিছুটা হলেও কমেছে। কারণ, লিবিয়ার নিরাপত্তা বাহিনীকে অভিবাসী অনুপ্রবেশের উপর নজরদারী চালানোর দায়িত্ব দিয়েছে ইটালি। ফলে মাঝসমুদ্রে কোনো শরণার্থীদের নৌকা নজরে এলেই সেটিকে আটক করার নির্দেশ পায় লিবিয়ার বাহিনী। কিন্তু, এরপরেও চলতি বছরই অন্তত ১৫ হাজার ৯০০ জন উদ্বাস্তু ইউরোপে ঢুকেছেন বলে জানাচ্ছে ইউএনএইচসিআর। ২০১৮ সালে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার সময় প্রতিদিন গড়ে ৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন।

ইউএনএইচসিআর বলছে, লিবিয়া থেকে ইউরোপের যাওয়ার জন্য ভূমধ্যসাগরের ওই সমুদ্রপথে এ বছরের প্রথম চার মাসে অন্তত ১৬৪ জন শরণার্থী প্রাণ হারিয়েছেন। লিবিয়া, ইরাক, সিরিয়াসহ আফ্রিকার নানা দেশের লোকেদের সাথে কেনো এভাবে ইউরোপ যাচ্ছেন বাংলাদেশিরা?

সমুদ্রপথ পাড়ি দিতে গিয়ে ২০১৫ সালে নিহত সিরীয় শিশু আয়লানের ছবি সবাইকে কাঁদিয়েছিলো। কিন্তু, আমরা কতোজন জানি লিবিয়ায় নিহত বাংলাদেশি শিশু ইউসুফের কথা? বাবা রমযান আলীর সাথে শিশুটি সেদিন ভেসে গিয়েছিলো ভূমধ্যসাগরে। ওই ঘটনায় নিহত বাংলাদেশিদের একজন শাহাদাত। তার বাড়ি লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে। 
শাহাদাতের মা বকুল আক্তার আমাকে আহাজারি করে বলেছিলেন, ‘আমার একটাই ছেলে। ওর বাপও সৌদিতে থাকে। আমরা সবাই শাহাদাতকে না করেছিলাম এভাবে যেতে। ওর বাবাও বলেছে, তুই আমার একটাই ছেলে, যাইস না। কিন্তু, ছেলেটা আমার পৃথিবী থেকেই চলে গেলো। আমি কী নিয়ে বাঁচবো?’ ছেলে হারানোর চার বছর পেরিয়ে গেলেও শাহাদাতের মায়ের সেই আহাজারি থামেনি। আবার সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে শাহাদাত বা রুবেলদের ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টাও বন্ধ হয়নি।

আমরা অনেক সময় খুশি থাকি এই ভেবে যে বিদেশে লাখ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হচ্ছে। ২০১৭ সালে তো নতুন রেকর্ড গড়ে বাংলাদেশ। ওই বছর ১০ লাখ আট হাজার ৫২৫ জন বাংলাদেশি চাকরি নিয়ে বিদেশে গেছেন। আবার সে বছরেরই ৫ মে ব্রিটেনের প্রভাবশালী দৈনিক ইন্ডিপেনডেন্ট একটি সংবাদ প্রকাশ করে। শিরোনাম ছিলো ‘বাংলাদেশ ইজ নাও দ্য সিঙ্গেল বিগেস্ট কান্ট্রি অব অরিজিন ফর রিফিউজিস অন বোটস অ্যাজ নিউ রুট টু ইউরোপ এমারজেস’।

ওই সংবাদে লিবিয়া থেকে সমুদ্রপথ পাড়ি দেওয়াসহ ইউরোপে কীভাবে অবৈধ বাংলাদেশিরা প্রবেশ করছে, তার তথ্য তুলে ধরা হয়। সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে বা অবৈধভাবে বাংলাদেশিরা যেমন ইউরোপে প্রবেশ করছেন, তেমনি দেশটিতে গিয়ে আশ্রয় চাওয়ার সংখ্যাও কম নয়। 
ইউএনএইচসিআর-এর তথ্য ঘেঁটে জানা গেলো, গত এক দশকে অন্তত এক লাখ বাংলাদেশি ইউরোপে আশ্রয় চেয়েছেন৷ এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রায় ১৮ হাজার আশ্রয় চেয়েছেন ২০১৫ সালে। আগের বছরগুলো ধরলে এই সংখ্যা লাখ দেড়েক হয়ে যাবে।

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) তথ্য অনুযায়ী, ভূমধ্যসাগর দিয়ে যতো মানুষ প্রবেশ করেছেন, সেই তালিকার শীর্ষ দশ দেশের নাগরিকদের মধ্যে প্রায়ই বাংলাদেশও থাকছে। চলতি বছর ওই তালিকায় থাকা শীর্ষ দেশগুলো হলো: আফগানিস্তান, গায়েনা, মরক্কো, সিরিয়া, মালি, ইরাক, ফিলিস্তিন, আইভরি কোস্ট এবং সেনেগাল। খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে, বাংলাদেশের নাগরিকরা কেনো আফ্রিকা বা যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার নাগরিকদের সাথে এভাবে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিচ্ছেন?

ইউরোপীয় কমিশনের পরিসংখ্যান দফতর ইউরোস্ট্যাট-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৮ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত এক লাখেরও বেশি বাংলাদেশি ইউরোপের দেশগুলোতে অবৈধভাবে প্রবেশ করেছেন। এইতো বছর দুয়েক আগেও সাগরপথ দিয়ে হাজারো মানুষের মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশ বিশ্বজুড়ে খবর হয়েছিলো। মালয়েশিয়ার সেই গণকবরগুলোর স্মৃতি ভুলবো কী করে! কারণ আমাকেও যে সেগুলো দেখতে যেতে হয়েছিলো। শুনতে হয়েছিলো আহাজারি। এই যে বিদেশের স্বপ্নে বিভোরতায় মৃত্যুঝুঁকি নেওয়া, সেটি থামবে কবে?

প্রশ্ন হলো, কেনো এতো লোক এভাবে ইউরোপে যাচ্ছেন? সিরিয়া, লিবিয়ায় না হয় যুদ্ধ চলছে, তাই সেখানকার নাগরিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সুমদ্রপথ পাড়ি দিচ্ছেন। কিন্তু, বাংলাদেশিরা কেনো জীবনের এতো ঝুঁকি নিচ্ছেন? শুধুই কি ভাগ্য অন্বেষণ, নাকি যে কোনোভাবে বিদেশে যাওয়ার নেশা?

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম সম্প্রতি তরুণদের মধ্যে যে জরিপ করেছে, তাতে দেখা গেছে আরো ভালো জীবনযাপন এবং পেশার উন্নতির জন্য বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ৮২ শতাংশ তরুণই নিজের দেশ ছেড়ে চলে যেতে চান। এসব তরুণ মনে করেন না যে নিজের দেশে তাদের ভবিষ্যৎ আছে। তাছাড়া এমনিতেই বাংলাদেশিদের মধ্যে বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন ভয়াবহ।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, গত চার দশকে এক কোটি বাংলাদেশি চাকরি নিয়ে বিদেশে গেছেন৷ আর এদের ৭৫ শতাংশই গেছেন মধ্যপ্রাচ্যে৷ কিন্তু অবৈধভাবে কতো লোক বিদেশে যান তার কোনো হিসাব বাংলাদেশের কোনো দফতরে নেই৷ তবে এক যুগেরও বেশি সময় অভিবাসন ও মানবপাচার বিষয় নিয়ে সাংবাদিকতা করতে গিয়ে দেখেছি, সংখ্যাটি নেহাতই কম নয়।

২০১১ সালের ১৮ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবসে একটি প্রতিবেদনে দেখিয়েছিলাম, ছাত্র বা পর্যটক সেজে কিংবা নানা পন্থায় বছরে অন্তত এক লাখ মানুষ অনিয়মিত পন্থায় বিদেশে যান৷ এর কারণ, বিদেশের স্বপ্নে বিভোর বহু মানুষ মনে করেন যে সাগর, মরুভূমি পাড়ি দিয়ে বিদেশে গেলেই মিলে যাবে স্বপ্নের চাবিকাঠি। আর তা যদি হয় ইউরোপ, তাহলে তো কথাই নেই।

ইউরোপের জেলখানায় থাকা এবং দেশে ফেরত আসা অনেকের সাথেই নানা সময় কথা হয়েছে। তারা বলছেন, লিবিয়ায় যুদ্ধ শুরুর পর বহু মানুষ ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশ করেছেন। এছাড়া, সিরিয়ায় শরণার্থীদের পরিস্থিতির সুযোগে সেই প্রচেষ্টা আরো বেড়ে যায়। মানবপাচারকারীরা তখন বাংলাদেশিদের ইউরোপ যেতে প্রলুব্ধ করে। ফলে ২০১৫ সাল থেকেই সংখ্যাটি বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যারা কাজ করতেন, তাদের অনেকেই মানবপাচারকারীদের প্রলোভনে পড়ে ইতিমধ্যে ইউরোপের পথে পাড়ি দিয়েছেন। এখনো সেই চেষ্টা আছে।

ইউরোপ ফেরত এসব লোকদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে, আমরা শুনি কীভাবে লোকজন বাংলাদেশ থেকে জমিজমা বিক্রয় করে দালালকে ছয় থেকে দশ লাখ টাকা দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। তারা বলছেন, ঢাকা থেকে লিবিয়া বা তুরস্ক যেতে একজনকে দশ হাজার ডলারের বেশি অর্থ দিতে হয়। এরপর একটি চক্র ঢাকা থেকে তাদের দুবাই বা তুরস্কে নেয়। পরে বিমানে করে লিবিয়ায় পৌঁছান তারা। সেখান থেকে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এছাড়া লিবিয়ায় অনেকদিন ধরে আছেন এমন লোকজনও পরবর্তীতে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিচ্ছেন ইউরোপে যাওয়ার নেশায়। মূলত ইউরোপে গেলেই ভাগ্য ফিরবে, এমন আশাতেই লোকজন যাচ্ছেন।

ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়ের কাজ করে ‘ফ্রন্টেক্স’ নামের একটি সংগঠন। ২০১৫ সাল থেকে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে আমার। তারা বলছে, ইউরোপ অভিমুখে এখন শরণার্থীদের যে ¯্রােত, তাতে অসংখ্য বাংলাদেশি রয়েছেন। বিশেষ করে লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে ইতালি (সেন্ট্রাল মেডিটেরিয়ান রুট) যাচ্ছেন হাজার হাজার বাংলাদেশি৷ এভাবে যেতে গিয়ে প্রতারণার ঘটনা ঘটছে। সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে ট্রলার ডুবি হচ্ছে। ইউরোপের জেলে বন্দি রয়েছেন অনেকে। কেউবা গ্রেফতার হচ্ছেন তুরস্কে।

অনেক বাংলাদেশিরই জানা নেই, ইউরোপের পরিস্থিতি এখন ভিন্ন। ইউরোপ এখন আর অবৈধভাবে আসা লোকজনকে আশ্রয় দিতে রাজি নয়, বরং কাগজপত্রহীন মানুষগুলোকে নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়ে দিচ্ছে। এই তো বছর দুয়েক আগে ইউরোপ বলে বসলো, এক লাখ অবৈধ বাংলাদেশি আছে ইউরোপের দেশগুলোতে। তাদের ফিরিয়ে না নিলে ভিসা বন্ধের হুমকিও দিয়েছিলো ইউরোপ। কিন্তু, আমি মনে করি এই ধরনের চাপ একটি স্বাধীন দেশের জন্য খুবই অস্বস্তিকর। যদিও পরে বাংলাদেশ কাগজপত্র ঠিক না থাকা বাংলাদেশিদের ফেরত আনতে একটি এসওপি স্বাক্ষর করে।

কাজের সন্ধানে একটু কম শিক্ষিতরা যেমন ইউরোপে যাচ্ছেন, তেমনি ইউরোপে গিয়ে রাজনৈতিক বা অন্য কোনো আশ্রয় চেয়েছেন এমন লোকের সংখ্যাও অনেক। ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৭ হাজার ২১৫ জন বাংলাদেশি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছেন। এদের মধ্যে ১১ হাজার ৭১৫ জনের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। কথা হলো, এতো মানুষজন কেনো ইউরোপে আশ্রয় চাইছেন?

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ১৯ লাখ ৫৮ হাজার ১২৬ জন ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়েছেন। এভাবে সাগরপথে আসতে গিয়ে অন্তত ১৮ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। কিন্তু, তবুও ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা থেমে নেই। প্রশ্ন হলো কবে থামবে? আর কতো মানুষের প্রাণ গেলে হুঁশ ফিরবে আমাদের? আর কবে সচেতন হবে মানুষ?

লেখক : প্রোগ্রাম প্রধান, মাইগ্রেশন, ব্র্যাক।

মাইগ্রেশননিউজবিডি.কম/সাদেক ##

share this news to friends